আন্দোলনে সরব জামায়াত: বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে অর্থনৈতিক সংকটের বিরুদ্ধে লংমার্চের ডাক
আন্তর্জাতিক ও রাজনৈতিক ডেস্ক:
দক্ষিণ এশিয়ার দুই মুসলিমপ্রধান দেশ বাংলাদেশ ও পাকিস্তান—ভৌগোলিক সীমানা আলাদা হলেও বর্তমানে দুই দেশের রাজপথই উত্তপ্ত প্রায় একই ধরনের জনসম্পৃক্ত অর্থনৈতিক ইস্যুতে। বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতা, তীব্র জ্বালানি সংকট এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির এই সময়ে উভয় দেশের রাজনৈতিক ময়দানেই সরব উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে জামায়াতে ইসলামীর। বাংলাদেশে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোট বিভিন্ন বিভাগ অভিমুখে একের পর এক লংমার্চ কর্মসূচি পালন করছে; অন্যদিকে পাকিস্তানে পেট্রোলিয়াম শুল্ক প্রত্যাহার ও অস্বাভাবিক মূল্যস্ফীতির প্রতিবাদে ‘সুপার ট্রেন’ লংমার্চ ও ইসলামাবাদ পদযাত্রায় উত্তাল রাজপথ।
বাংলাদেশে ১১-দলীয় ঐক্যের রংপুরমুখী লংমার্চ
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে রাজপথে নতুন শক্তিবলয় গড়ে তুলেছে জামায়াতে ইসলামীসহ ১১টি সমমনা দল। গত ৫ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম অভিমুখী লংমার্চে ছয় দফা দাবি উপস্থাপন করেছিল এই জোট। সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল—গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার, বিদ্যুৎ-জ্বালানি তেল-গ্যাস ও সারের সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি রোধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং প্রশাসনে সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ করা।
চট্টগ্রামের কর্মসূচির পর এবার আট দফা দাবিতে রংপুর অভিমুখে জোটের দ্বিতীয় বড় লংমার্চের চূড়ান্ত প্রস্তুতি চলছে। উত্তরবঙ্গমুখী এই লংমার্চে জাতীয় ইস্যুগুলোর সঙ্গে আঞ্চলিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর দাবি ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন’ যুক্ত করা হয়েছে। রংপুর জিলা স্কুল মাঠের সমাপনী সমাবেশে ৩ থেকে ৫ লাখ মানুষের সমাগম ঘটানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে জোটটি। ঢাকা থেকে শুরু হওয়া এই গাড়িবহরে বিভিন্ন জেলা থেকে হাজারো যানবাহন যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। তবে কর্মসূচিতে কোনো প্রকার উসকানির মুখে পা না দিয়ে কর্মীদের শান্ত থাকার এবং সরকারকে কোনো বাধা না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে জোট নেতৃত্ব।
পাকিস্তানে প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধে লংমার্চ সাময়িক স্থগিত
পাকিস্তানে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্ত অনুযায়ী সাধারণ মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া অতিরিক্ত পেট্রোলিয়াম লেভি ও লাগামহীন মূল্যস্ফীতির প্রতিবাদে করাচি থেকে ইসলামাবাদ অভিমুখে বিশাল ‘সুপার ট্রেন’ পদযাত্রা শুরু করে জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তান।
আন্দোলন পাঞ্জাবের মুলতানে পৌঁছালে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে হস্তক্ষেপ করেন জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগ দিতে বিদেশে অবস্থানরত পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) তিনি টেলিফোনে পাকিস্তানের জামায়াত আমির হাফিজ নাঈম-উর-রহমানের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী দেশে না ফেরা পর্যন্ত পদযাত্রা স্থগিত রাখার অনুরোধ জানান এবং ফিরে এসে তেল শুল্ক ও অর্থনৈতিক সংকট নিরসনে জামায়াত নেতৃত্বের সঙ্গে সরাসরি সমঝোতা বৈঠকে বসার প্রতিশ্রুতি দেন।
প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসে মুলতানে সংবাদ সম্মেলন করে পদযাত্রা সাময়িকভাবে স্থগিত ঘোষণা করেন জামায়াত আমির হাফিজ নাঈম-উর-রহমান। তবে তিনি পরিষ্কার জানিয়ে দেন, এটি কেবল সাময়িক বিরতি, কোনোভাবেই আন্দোলনের সমাপ্তি নয়; দাবি আদায়ের লিখিত সমাধান না আসা পর্যন্ত দেশজুড়ে অবস্থান ধর্মঘট বহাল থাকবে।
দুই দেশের আন্দোলনের সমীকরণ ও জামায়াতের বক্তব্য
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দুই দেশেই জামায়াতে ইসলামী সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সংকটকে তাদের আন্দোলনের মূল হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছে। আইএমএফের শর্ত কিংবা ভর্তুকি প্রত্যাহারের মতো অর্থনৈতিক ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে তারা রাজপথে ব্যাপক জনসমর্থন টানার কৌশল নিয়েছে।
এদিকে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় এক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, “বাংলাদেশে আমাদের দাবি অত্যন্ত সুস্পষ্ট এবং এটি কোনো একক দলের নয়; ১১টি দলের ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত ও গোটা দেশবাসীর প্রাণের দাবি। গণঅভ্যুত্থানের গণরায়ের ভিত্তিতে কার্যকর সংস্কার, ফ্যাসিবাদের গণহত্যার বিচার এবং নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ও জ্বালানি সংকট নিরসনেই আমরা রাজপথে নেমেছি। এর সঙ্গে অন্য কোনো দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কের সূত্র খোঁজা সম্পূর্ণ অবান্তর।”
পাকিস্তানের পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা ও সরকারের সমঝোতার বিষয়ে তিনি উল্লেখ করেন, “অন্য দেশের রাজনীতির সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। সরকারের সঙ্গে আলোচনার মূল প্ল্যাটফর্ম সংসদ; কিন্তু জনগণের সমস্যা সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ার কারণেই আমরা রাজপথে নেমেছি। সরকার যদি জনগণের যৌক্তিক দাবিগুলো মেনে নেয়, তবে আমরা সেটিকে অবশ্যই স্বাগত জানাব; কারণ জনগণের ন্যায্য অধিকার আদায়ই আমাদের আন্দোলনের একমাত্র লক্ষ্য।”
এস এম সোহাগ ফরাজী