মাধবপুরে কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগে সালিস: ‘ইজ্জতের মূল্য’ ধরা হলো ৯০ হাজার টাকা, এলাকায় তীব্র ক্ষোভ
স্টাফ রিপোর্টার / হবিগঞ্জ প্রতিনিধি: হবিগঞ্জের মাধবপুরে এক কিশোরীকে ধর্ষণের গুরুতর অভিযোগ ধামাচাপা দিতে স্থানীয়ভাবে সালিস বসিয়ে ৯০ হাজার টাকায় রফাদফার চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। সালিসের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ইতিমধ্যে ভুক্তভোগীর পরিবারকে নগদ ২০ হাজার টাকা প্রদান করা হয়েছে এবং অবশিষ্ট ৭০ হাজার টাকা আগামী ১০ সেপ্টেম্বর পরিশোধের দিন ধার্য করা হয়েছে।
ধর্ষণের মতো ফৌজদারি ও স্পর্শকাতর অপরাধকে অর্থের বিনিময়ে সালিসে মীমাংসার এমন উদ্যোগে স্থানীয়দের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
ঘটনার বিবরণ ও ভুক্তভোগীর অভিযোগ
ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, অভিযুক্ত হানিফ মিয়ার (২৫) স্ত্রী প্রবাসে থাকায় তিনি মেয়েকে নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে বসবাস করতেন। গত ২০ আগস্ট ২০২৬ দুপুরে বাড়ির লোকজনের অনুপস্থিতির সুযোগে হানিফ ওই কিশোরীকে কৌশলে ঘরে ডেকে নিয়ে ধর্ষণ করেন।
ঘটনার পর কিশোরী বিষয়টি তার মাকে জানালে স্বজনরা হানিফের বাড়িতে যাওয়ার আগেই সে পালিয়ে যায়। ওই দিন বিকেলেই কিশোরীকে হবিগঞ্জ ২৫০ শয্যা জেলা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং স্বাস্থ্য পরীক্ষা শেষে গত ২৩ আগস্ট সে বাড়ি ফেরে।
আইনি প্রক্রিয়ার বদলে সালিসের রফাদফা
হাসপাতাল থেকে ফেরার পর ভুক্তভোগী পরিবার মামলা করতে চাইলেও স্থানীয় প্রভাবশালী ও মাতব্বরদের চাপে তা সম্ভব হয়নি। গত শুক্রবার স্থানীয় ইউপি সদস্য আবেদুর রহমানের মধ্যস্থতায় এ সালিস বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার হরিপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান জামাল মিয়াসহ স্থানীয় ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
সালিসে অভিযুক্তের পক্ষ থেকে কিশোরীর পরিবারকে ক্ষতিপূরণ বাবদ ৯০ হাজার টাকা দেওয়ার রায় দেওয়া হয়। সালিসেই নগদ ২০ হাজার টাকা দেওয়া হয় এবং বাকি টাকা পরিশোধে সময় নির্ধারণ করা হয়।
ভুক্তভোগী কিশোরীর মা বলেন, “আমার মেয়েকে ফুসলিয়ে নিয়ে ধর্ষণ করেছে হানিফ। আমরা থানায় মামলা করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু গ্রামের মাতব্বররা মামলা করতে দেয়নি। ইউপি সদস্য আবেদুর রহমানসহ কয়েকজন মিলে জোর করে ৯০ হাজার টাকা ধার্য করে আমাকে ২০ হাজার টাকা ধরিয়ে দিয়েছে।”
মাতব্বর ও পুলিশের বক্তব্য
ধর্ষণের মতো অপরাধ সালিসে মীমাংসার বিষয়ে জানতে চাইলে ইউপি সদস্য আবেদুর রহমান দাবি করেন, “ঘটনাটি ধর্ষণ নয়, ধর্ষণের চেষ্টা ছিল। দুই পক্ষই অত্যন্ত দরিদ্র হওয়ায় মামলা পরিচালনার সামর্থ্য নেই। তাই সাবেক চেয়ারম্যান জামাল মিয়াসহ গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সবকিছু আইনে সমাধান হয় না।”
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান জামাল মিয়ার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা ও বার্তা পাঠানো হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
মাধবপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সোহেল রানা জানান, “এ ঘটনায় মঙ্গলবার পর্যন্ত পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়নি। তবে অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিক কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সালিসের বিষয়টিও খতিয়ে দেখছে পুলিশ।”
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের ক্ষেত্রে আইনি পদক্ষেপ না নিয়ে টাকার অঙ্কে ‘ইজ্জতের মূল্য’ নির্ধারণকারী সালিসকারীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা জরুরি।
দৈনিক জীবনযাত্রা