যশোরে জুলাই স্মৃতিস্তম্ভে রাতের আঁধারে আগুন: কর্তব্যে অবহেলায় দুই পুলিশ ক্লোজ, সিসিটিভি ফুটেজ দেখে শনাক্তে অভিযান
স্টাফ রিপোর্টার:
যশোর শহরের প্রাণকেন্দ্র বকুলতলা মোড়ে অবস্থিত ঐতিহাসিক ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভে’ রাতের আঁধারে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার দায়ে দুই পুলিশ সদস্যকে তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাহার (ক্লোজ) করা হয়েছে। সোমবার (২ নভেম্বর ২০২৬) ভোররাতে দুর্বৃত্তরা সুপরিকল্পিতভাবে স্মৃতিস্তম্ভটিতে অগ্নিসংযোগ করে পালিয়ে যায়।
এ ঘটনার ৩৫ সেকেন্ডের একটি সিসিটিভি ফুটেজের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ার পর যশোর শহরজুড়ে শিক্ষার্থী, রাজনৈতিক মহল ও সাধারণ মানুষের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে।
ভিডিওতে যা দেখা গেছে:
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ৩৫ সেকেন্ডের ওই ভিডিওটিতে দেখা যায়, ভোরের রাতের গভীর অন্ধকারে দুই দুর্বৃত্ত দ্রুতবেগে স্মৃতিস্তম্ভ চত্বরে প্রবেশ করে এবং কোনো দাহ্য পদার্থ ব্যবহার করে আগুন ধরিয়ে দেয়। মুহূর্তের মধ্যেই দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে ওঠে। এরপর তিন যুবককে স্মৃতিস্তম্ভের মূল বেদি থেকে লাফিয়ে নেমে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করতে দেখা যায়। এ সময় তাঁদের মুখে নিষিদ্ধ রাজনৈতিক স্লোগান ‘শেখ হাসিনা’ ও ‘জয় বাংলা’ শোনা যায়।
সোমবার দুপুরে সরেজমিনে স্মৃতিস্তম্ভ এলাকা পরিদর্শন করে দেখা গেছে, আগুনে নবনির্মিত স্থাপনাটির বিভিন্ন অংশ পুড়ে কালো দাগ হয়ে গেছে এবং বেশ কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
নিরাপত্তা জোরদার ও সতর্কাবস্থানে পুলিশ:
বর্বরোচিত এ ঘটনার পরপরই জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ এলাকায় পুলিশি নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি ও সংঘাত এড়াতে চত্বরে অতিরিক্ত পুলিশ ও আর্মড ব্যাটালিয়ন মোতায়েন করা হয়েছে।
একই সঙ্গে শহরের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ও ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোতে পুলিশের বিশেষ নজরদারি ও টহল বাড়ানো হয়েছে। সার্বিক আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে যৌথ বাহিনী।
নিষিদ্ধ সংগঠনের সামাজিক মাধ্যমে প্রচারের অভিযোগ:
এদিকে পুলিশের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, স্মৃতিস্তম্ভে আগুন দেওয়ার এই ভিডিওটি কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত যুবলীগ ও ছাত্রলীগের কয়েকজন পলাতক নেতা নিজেদের ফেসবুক আইডি ও পেজ থেকে ব্যাপক প্রচার করছেন।
পুলিশের তদন্ত তালিকায় প্রাথমিকভাবে যশোরের যুবলীগ নেতা আনোয়ার হোসেন বিপুল, পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর আলমগীর কবির সুমন এবং নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সদর উপজেলা শাখার সাবেক আহ্বায়ক রবিউল ইসলামের নাম উঠে এসেছে। তাঁদের অনলাইন তৎপরতার ওপর নজর রাখছে সাইবার ক্রাইম ইউনিট।
পুলিশ প্রশাসনের কঠোর বার্তা:
ঘটনার সত্যতা ও দুই পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার বিষয়টি নিশ্চিত করে যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মিরাজুল ইসলাম জানান, “প্রতিদিন সন্ধ্যার পর থেকেই স্মৃতিস্তম্ভ চত্বরের সার্বিক নিরাপত্তার জন্য দুজন পুলিশ সদস্যকে নিয়মিত দায়িত্ব দেওয়া থাকে। সোমবার ভোররাতেও দুজন সদস্য সেখানে দায়িত্বরত ছিলেন। কিন্তু সেই দায়িত্ব চলাকালীন রাতের আঁধারে দুই দুর্বৃত্ত স্মৃতিস্তম্ভ চত্বরে ঢুকে আগুন ধরিয়ে দ্রুত পালিয়ে যায়।”
তিনি আরও কঠোরভাবে বলেন, “কর্তব্যে চরম অবহেলার প্রমাণ পাওয়ায় সেখানে দায়িত্বরত ওই দুই পুলিশ সদস্যকে তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইন্সে ক্লোজ করা হয়েছে। স্মৃতিস্তম্ভের আশপাশের সকল ভবনের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। ফুটেজ গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে আগুন দেওয়ার সাথে জড়িত অপরাধীদের দ্রুততম সময়ে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে।”
দৈনিক জীবনযাত্রা
এস এম সোহাগ ফরাজী