জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট থেকে কি সরে আসছে এনসিপি?: আসন বণ্টন ও লংমার্চ ঘিরে দৃশ্যমান টানাপোড়েন
রাজনৈতিক প্রতিবেদক:
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের সাম্প্রতিক মাঠপর্যায়ের নানা কর্মসূচিতে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) শীর্ষ নেতাদের অনুপস্থিতি এবং ধারাবাহিক নানা অসন্তোষ ঘিরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন মেরুকরণের আভাস মিলছে। আসন ভাগাভাগি নিয়ে মতানৈক্য ও নীতিগত ফারাকের জেরে শেষ পর্যন্ত এনসিপি এই জোট থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে কি না—তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন ক্রমশ জোরালো হচ্ছে।
দলীয় অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, গত ২১ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে এনসিপির রাজনৈতিক পর্ষদের এক গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও সদস্য সচিব আখতার হোসেনের উপস্থিতিতে ওই বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলটি ১১ দলীয় জোটের ব্যানারে একযোগে অংশ নেবে না। এর পাশাপাশি জোটের যৌথ কর্মসূচিতেও দলীয় অংশগ্রহণ ও দৃশ্যমানতা ধাপে ধাপে কমিয়ে আনার কৌশলগত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। মূলত মাঠপর্যায়ে এককভাবে নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি ও রাজনৈতিক সক্ষমতা যাচাই করতেই দলটির এমন অবস্থান।
ঢাকা সিটিতে সংঘাত ও বৈঠক বর্জন:
জোটের সঙ্গে দূরত্বের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে আসন্ন ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন। এনসিপি ইতোমধ্যে এককভাবে প্রার্থী ঘোষণা করেছে—ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে দলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এবং উত্তর সিটিতে সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।
তবে জোটের প্রধান শরিক জামায়াত স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ দুই সিটির কোনোটিতেই তারা শরিক দলকে ছাড় দিতে প্রস্তুত নয়। এর পরিবর্তে তারা এনসিপিকে কুমিল্লা ও ময়মনসিংহ সিটিতে ছাড় দেওয়ার বিকল্প প্রস্তাব দেয়। জামায়াতের এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে তাৎক্ষণিকভাবে আসন বণ্টনের বৈঠক ছেড়ে বেরিয়ে যান এনসিপির দায়িত্বশীল নেতারা। এরপর থেকেই মূলত দুই দলের সম্পর্কে প্রকাশ্য শৈত্যপ্রবাহ দেখা দেয় এবং শীর্ষ পর্যায়ের যৌথ বৈঠকগুলোতে অংশ নেওয়া বন্ধ করে দেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।
খুলনামুখী লংমার্চে অনুপস্থিত নাহিদ ইসলাম, অনীহা নেতাকর্মীদের:
১১ দলীয় ঐক্যের সাত দফা দাবিতে গত শনিবার (৩১ অক্টোবর) ঢাকা থেকে খুলনা ও কুষ্টিয়ামুখী লংমার্চের আয়োজন করা হয়। সকাল ৮টা ২০ মিনিটে বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেট থেকে গাড়িবহর উদ্বোধনের সময় প্রধান বক্তব্য রাখেন জামায়াতের আমীর ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান।
মঞ্চে জামায়াত আমীরের ঠিক পাশেই এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের নামে নির্দিষ্ট চেয়ার রাখা হলেও তিনি পুরো কর্মসূচিতে উপস্থিত হননি। তাঁর পরিবর্তে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব, সংসদ সদস্য আব্দুল হান্নান মাসউদ এবং সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব সার্জিস আলম উপস্থিত থাকলেও তাঁদের কেউ বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ নেননি। এমনকি জামায়াতের ভেরিফায়েড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ছবিতেও এনসিপি নেতাদের উপস্থিতি একপ্রকার উপেক্ষিতই ছিল। মাঠপর্যায়ের নেতা-কর্মীদের মাঝেও যৌথ লংমার্চ নিয়ে কোনো স্বতঃস্ফূর্ত উচ্ছ্বাস দেখা যায়নি।
ঠাকুরগাঁও উপনির্বাচন ঘিরে ক্ষোভের বিস্ফোরণ:
গত ২৯ অক্টোবর অনুষ্ঠিত ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচন দুই দলের মধ্যকার এই মনস্তাত্ত্বিক দূরত্বকে আরও উসকে দেয়। ওই নির্বাচনে জামায়াত সমর্থিত প্রার্থীর পরাজয়ের পর ভোটের তথাকথিত অনিয়ম নিয়ে দলটি কোনো শক্ত রাজনৈতিক কর্মসূচি না দেওয়ায় ক্ষুব্ধ হয় এনসিপি নেতৃত্ব। বিশেষ করে নির্বাচনের পরপরই বিজয়ী বিএনপি প্রার্থীর হাত থেকে পরাজিত জামায়াত প্রার্থীর হাসিমুখে মিষ্টি খাওয়ার দৃশ্যটি এনসিপির তরুণ নেতৃত্ব অত্যন্ত নেতিবাচকভাবে গ্রহণ করে।
এরই প্রেক্ষিতে গত শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) রাজধানীর শাহবাগে আয়োজিত এনসিপির নিজস্ব গণবিক্ষোভ সমাবেশে প্রকাশ্যে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া।
‘সম্পর্ক খারাপ নয়, জোটটি আদর্শিকও নয়’—এনসিপির ব্যাখ্যা:
জোটের সাথে ফাটল ধরার জল্পনা পুরোপুরি উড়িয়ে না দিলেও বিষয়টিকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করেছেন এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন।
গণমাধ্যমের প্রশ্নের জবাবে তিনি মন্তব্য করেন, “সম্পর্ক খারাপ যাচ্ছে—এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই। বিষয়টি হলো, একটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আরেক দলের সম্পর্ক কোনো স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মতো নয়। প্রতিটি রাজনৈতিক দলের নিজস্ব কিছু এজেন্ডা থাকে, যেখানে জাতীয় স্বার্থে এক ধরনের কৌশলগত ঐক্য গড়ে ওঠে। জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির কোনো দীর্ঘমেয়াদী আদর্শিক জোট হয়নি; এটি মূলত একটি নির্বাচনী ঐক্যের বোঝাপড়া। ফলে জোটের কর্মসূচির পাশাপাশি এনসিপি তার নিজস্ব স্বতন্ত্র স্বকীয়তা ও কর্মসূচি নিয়ে রাজপথে থাকবে।”
এস এম সোহাগ ফরাজী