কমলগঞ্জে জমি বিক্রি নিয়ে বিরোধের জেরে প্রতিপক্ষের বর্বরোচিত হামলা: চিকিৎসাধীন অবস্থায় যুবকের মৃত্যু, ভাই হাসপাতালে, আটক ১
মৌলভীবাজার প্রতিনিধি (শাহ তোফাজ্জুল হোসেন ভান্ডারী):
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলায় জমি বিক্রিকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে প্রতিপক্ষের সশস্ত্র হামলায় জাহাঙ্গীর আলম (২৯) নামে এক যুবক নিহত হয়েছেন। এ হামলায় নিহতের বড় ভাই জহিরুল ইসলাম জসিমও ধারালো অস্ত্রের কোপে গুরুতর আহত হয়ে আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
রবিবার (১ নভেম্বর ২০২৬) বিকেলে উপজেলার বড়গাছ গ্রামে এই রক্তাক্ত হামলার ঘটনা ঘটে। পরে রাত আনুমানিক ২টার দিকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় জাহাঙ্গীরের মৃত্যু হয়।
নিহত জাহাঙ্গীর আলম বড়গাছ গ্রামের উম্মর মিয়ার ছেলে। তিনি পেশায় একজন মধ্যস্থতাকারী এবং ১৪ মাস বয়সী এক কন্যাসন্তানের জনক ছিলেন। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ময়নুল হক (২৮) নামে একজনকে তাৎক্ষণিকভাবে আটক করেছে পুলিশ।
বিরোধের সূত্রপাত জমি বিক্রি নিয়ে:
স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগী পরিবার সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার রামপাশা গ্রামের যুক্তরাজ্যপ্রবাসী দুলা মাস্টারের ছেলে রিপন আহমেদের একটি জমি বিক্রিকে কেন্দ্র করে মধ্যস্থতাকারী জাহাঙ্গীরের পরিবারের সঙ্গে একই গ্রামের মৃত রশিদ মিয়ার তিন ছেলে মাহমুদ মিয়া (৩৫), মামুন মিয়া (৩০) ও ময়নুল হকের মধ্যে বেশ কিছুদিন ধরে চরম বিরোধ চলে আসছিল। এছাড়া স্থানীয় একটি মাদরাসার অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়েও কিছুদিন আগে এই দুই পক্ষের মধ্যে তীব্র বাদানুবাদ হয়েছিল।
রবিবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে জাহাঙ্গীরের চাচাতো ভাই সাহেল জমি কেনার আগ্রহ প্রকাশ করা দুজন ক্রেতাকে নিয়ে এলাকায় আসেন। জমিটি দেখানোর জন্য এবং বিস্তারিত আলোচনার স্বার্থে জাহাঙ্গীরের বড় ভাই জহিরুল ইসলাম জসিমকে ডেকে আনা হয়। জসিম ঘটনাস্থলে পৌঁছামাত্রই পূর্ব থেকে ওঁৎ পেতে থাকা প্রতিপক্ষ মৃত রশিদ মিয়ার ছেলেরা জমি বিক্রিতে সরাসরি বাধা দেন।
একপর্যায়ে উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তপ্ত বাকবিতণ্ডা শুরু হলে প্রতিপক্ষের লোকজন দা ও লাঠিসোঁটা নিয়ে জসিমের ওপর অতর্কিত ঝাঁপিয়ে পড়ে। তারা জসিমের মাথায় আঘাত করে এবং ধারালো দা দিয়ে কুপিয়ে রক্তাক্ত জখম করে।
বাঁচাতে গিয়ে প্রাণ গেল ভাইয়ের:
বড় ভাইয়ের ওপর হামলার খবর দ্রুত বাড়িতে পৌঁছালে জাহাঙ্গীর আলম ঘটনাস্থলে ছুটে যান ভাইকে রক্ষা করতে। কিন্তু তিনি পৌঁছামাত্র প্রতিপক্ষের হামলাকারীরা তাঁকেও লক্ষ্য করে আঘাত হানে। লাঠি ও ধারালো অস্ত্রের সরাসরি আঘাতে জাহাঙ্গীরের মাথায় মারাত্মক জখম হয় এবং তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।
পরে স্থানীয় লোকজন দ্রুত এগিয়ে এসে হামলাকারীদের হাত থেকে রক্তাক্ত দুই ভাইকে উদ্ধার করেন এবং আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাঁদের দ্রুত সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করান। সেখানে নিবিড় পর্যবেক্ষণে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় দিবাগত রাত আনুমানিক ২টার দিকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন জাহাঙ্গীর।
স্বজনদের আহাজারি ও পূর্বপরিকল্পনার অভিযোগ:
এদিকে নিহতের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় স্বজনদের বুকফাটা আহাজারি। জাহাঙ্গীরের মাত্র ১৪ মাস বয়সী শিশু সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের চোখেও জল নেমে আসে।
নিহতের চাচা সুন্দর আলী কান্নাজড়িত কণ্ঠে ক্ষোভ প্রকাশ করে অভিযোগ করেন, “এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, একটি সম্পূর্ণ পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। হামলার জন্য দা ও লাঠি আগে থেকেই প্রস্তুত করে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। মামুন, মাহমুদ ও ময়নুল—এই তিন ভাই মিলে তাঁদের ভাগনে সামি ও ভগ্নিপতি খয়েরকে সাথে নিয়ে এই বর্বর আক্রমণ চালিয়ে আমার ভাতিজাকে হত্যা করেছে।”
পুলিশের বক্তব্য ও পদক্ষেপ:
কমলগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কমর উদ্দিন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, ঘটনার পর নিহতের বাবার পক্ষ থেকে থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে ময়নুল হক নামের একজনকে তাৎক্ষণিকভাবে আটক করেছে পুলিশ।
ওসি আরও জানান, নিহতের মরদেহ ময়নাতদন্তের প্রক্রিয়া শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্য মূল আসামিদের দ্রুত শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশের একাধিক টিম মাঠে ধারাবাহিক অভিযান চালাচ্ছে।
দৈনিক জীবনযাত্রা
এস এম সোহাগ ফরাজী