প্রশাসনের মৌখিক নিষেধের পর সিনেমাটিক কায়দায় ছদ্মবেশ: গভীর রাতে বাইকে চড়ে নাসিরনগরের মাহফিলে তাহেরী, ভিডিও ভাইরাল
স্টাফ রিপোর্টার:
কওমিপন্থী আলেমদের প্রকাশ্য আপত্তি এবং অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে স্থানীয় প্রশাসনের মৌখিক সতর্কবার্তার মধ্যেই নাটকীয় ও ‘সিনেমাটিক’ কায়দায় ছদ্মবেশ ধারণ করে গভীর রাতে মাহফিলের মঞ্চে উপস্থিত হয়েছেন আলোচিত ইসলামী বক্তা মুফতি গিয়াস উদ্দিন তাহেরী।
সোমবার (২ নভেম্বর ২০২৬) দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার ভলাকুট ইউনিয়নের ইসাপুর সৈয়দ মঞ্জিল দরবার শরিফের মাহফিলে তাঁর এমন আকস্মিক ও ব্যতিক্রমী উপস্থিতি ঘিরে পুরো জেলাজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্য ও আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
যে কারণে জটিলতা ও প্রশাসনের নিষেধ:
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সোমবার রাত ১১টার দিকে ইসাপুর সৈয়দ মঞ্জিল দরবার শরিফে পূর্বনির্ধারিত বার্ষিক ওয়াজ মাহফিলে প্রধান বক্তা হিসেবে মুফতি তাহেরীর বয়ান করার কথা ছিল। তবে স্থানীয় কয়েকজন কওমি ঘরানার আলেম ও তাঁদের অনুসারীরা তাহেরীর আগমন নিয়ে তীব্র আপত্তি জানান।
এ নিয়ে এলাকায় দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দিলে সম্ভাব্য অপ্রীতিকর ঘটনা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এড়াতে নাসিরনগর থানা পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাহেরীকে ওই মাহফিলে না আসার জন্য মৌখিকভাবে পরামর্শ দেওয়া হয়।
মুখে কাপড় ও মাথায় পাগড়ি জড়িয়ে বাইক বহরে প্রবেশ:
প্রশাসনের এই মৌখিক নির্দেশনার পর সবাই যখন ধরে নিয়েছিলেন তাহেরী আর আসছেন না, ঠিক তখনই গভীর রাতে এক রোমাঞ্চকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। রাত আড়াইটার দিকে মাথায় বড় সবুজ পাগড়ি এবং মুখে কাপড় পেঁচিয়ে ছদ্মবেশ ধারণ করে একটি দ্রুতগতির মোটরসাইকেলের পেছনের আসনে চেপে দরবার শরিফে প্রবেশ করেন তিনি। এ সময় তাঁর সাথে বেশ কয়েকটি মোটরসাইকেলের একটি নিরাপত্তা বহরও দেখা যায়।
গভীর রাতে মঞ্চে উঠে তিনি স্বাভাবিকভাবেই ওয়াজ-নসিহত পেশ করেন। এটি ছিল নাসিরনগর এলাকায় তাঁর দ্বিতীয়বারের মতো কোনো মাহফিলে বয়ান। ওয়াজ শেষে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে প্রধান সড়ক এড়িয়ে বিকল্প গ্রামীণ সড়ক পথ ব্যবহার করে দ্রুত এলাকা ত্যাগ করেন তিনি। পরবর্তীতে নিজেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের ভেরিফায়েড পেজে ছদ্মবেশে মোটরসাইকেলে চড়ে মাহফিলে যাওয়ার রোমাঞ্চকর ভিডিওটি প্রকাশ করলে তা মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়।
পুলিশ ও স্থানীয় সুশীল সমাজের বক্তব্য:
নাসিরনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শাহিনুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, “কয়েকজন কওমিপন্থী আলেম মৌখিকভাবে এই মাহফিল নিয়ে তাঁদের আপত্তির কথা জানিয়েছিলেন। যে কারণে এলাকায় যাতে কোনো ধরনের সংঘাত বা গোলযোগ তৈরি না হয়, সেজন্যই তাহেরীকে মাহফিলে আসতে নিরুৎসাহিত করা হয়েছিল। পরে আমরা জানতে পারি, তিনি গভীর রাতে বিকল্প উপায়ে এসে ওয়াজ করে চলে গেছেন। পুরো রাতই পুলিশকে বিষয়টি নিয়ে সতর্ক নজরদারিতে থাকতে হয়েছে। তবে শান্তিপূর্ণ মাহফিল আয়োজনে পুলিশের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞা থাকে না।”
নাসিরনগর প্রেস ক্লাবের নেতা ফরাশ উদ্দিন এ বিষয়ে বলেন, “একজন ধর্মীয় বক্তা মাহফিলে বক্তব্য রাখবেন, এতে অহেতুক বাধা দেওয়া সমীচীন নয়। কারও কোনো বক্তব্য নিয়ে দ্বিমত থাকলে স্থানীয় প্রশাসন ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মধ্যস্থতায় মুক্ত আলোচনার মাধ্যমে তা সমাধান করা উচিত। রাজপথে সংঘাত বা উত্তেজনা তৈরি হলে তা সার্বিকভাবে ইসলামের শান্তির ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ন করে।”
আয়োজক ও সমর্থকদের দাবি:
এদিকে দরবার শরিফ ও মাহফিল পরিচালনা কমিটির আয়োজকরা জানিয়েছেন, কোনো ভিত্তিহীন বাধার মুখে মুফতি তাহেরীকে থামিয়ে রাখা সম্ভব নয়। ধর্মীয় সম্প্রীতি ও রাসুলপ্রেমের বার্তা জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে এমন বাধা অনভিপ্রেত। বিরোধিতার পথ পরিহার করে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আলোচনার মাধ্যমে আলেমদের মধ্যকার এই অভ্যন্তরীণ দূরত্বের অবসান ঘটানোর দাবি জানান তাঁরা।
এস এম সোহাগ ফরাজী