স্পীকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সাথে ঢাকায় নিযুক্ত চীনের বিদায়ী রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের সাক্ষাৎ: রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ও বাণিজ্য বিনিয়োগে জোর
সংসদীয় প্রতিবেদক:
বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের স্পীকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম এমপি’র সাথে সৌজন্য ও বিদায়ী সাক্ষাৎ করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন। মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬) জাতীয় সংসদ ভবনে স্পীকারের নিজস্ব কার্যালয়ে এই সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়।
সাক্ষাৎকালে স্পীকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, চীন বাংলাদেশের অন্যতম ঘনিষ্ঠ ও পরীক্ষিত বন্ধুরাষ্ট্র। শুরু থেকেই দেশটির সরকার ও জনগণ বাংলাদেশের সামগ্রিক অবকাঠামোগত ও আর্থসামাজিক উন্নয়নে সর্বতোভাবে সহযোগিতা করে আসছে। ইতিহাসের পটভূমি তুলে ধরে তিনি বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানই মূলত বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের আনুষ্ঠানিক ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। পরবর্তীতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া সেই সম্পর্ককে ধারাবাহিকভাবে আরও সুদৃঢ় ও সম্প্রসারিত করতে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখেন।
বিগত শাসনব্যবস্থার তীব্র সমালোচনা করে স্পীকার বলেন, “বিগত সরকারের দেড় দশকের স্বৈরাচারী শাসনামলে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, ব্যাপক অর্থ পাচার, গুম ও রাজনৈতিক খুনের মাধ্যমে এ দেশের কোটি কোটি মানুষের মৌলিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। তবে সর্বশেষ অনুষ্ঠিত অবাধ ও সুষ্ঠু সাধারণ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে পুনরায় প্রকৃত গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ ও চীনের জাতীয় সংসদের মধ্যে গঠিত ‘সংসদীয় মৈত্রী গ্রুপ’ দুই দেশের আইনসভার পারস্পরিক অভিজ্ঞতা বিনিময় ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশে অবস্থানরত মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত নাগরিকদের বিষয়ে স্পীকার বলেন, প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি ও তাদের সম্মানজনক প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া থমকে থাকায় বাংলাদেশকে নানামুখী অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এ মানবিক সংকট কাটিয়ে উঠতে এবং দ্রুত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে তিনি চীন সরকারের কার্যকর ও জোরালো সহযোগিতা কামনা করেন।
জবাবে চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান সরকার জনগণের প্রত্যক্ষ ম্যান্ডেট নিয়ে গঠিত একটি নির্বাচিত সরকার। বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক সফল চীন সফর দুই বন্ধুপ্রতিম দেশের মধ্যকার অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ককে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। রাষ্ট্রদূত বলেন, “চীন বর্তমানে বাংলাদেশের বৃহত্তম একক বাণিজ্যিক অংশীদার। বৃহৎ মেগাপ্রকল্পের বাইরেও বাংলাদেশে এখন মাঝারি ও ক্ষুদ্র বিভিন্ন খাতে চীনা উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে।”
তিনি আরও জানান, বেইজিং বাংলাদেশকে এই পুরো অঞ্চলে পণ্য উৎপাদনের অন্যতম প্রধান আঞ্চলিক কেন্দ্র (ম্যানুফ্যাকচারিং হাব) হিসেবে গড়ে তুলতে গভীরভাবে আগ্রহী। বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি (আইসিটি) ও সরবরাহ ব্যবস্থার লজিস্টিক পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করে দ্রুত অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জন করতে পারে।
বৈঠকে উভয় নেতা দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্য ভারসাম্য রক্ষা, নতুন বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কৌশলগত ‘বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডোর’ বাস্তবায়ন, চলমান রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান এবং বিদ্যুৎ-জ্বালানি নিরাপত্তা ইস্যু নিয়ে বিস্তারিত মতবিনিময় করেন।
এ সময় স্পীকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ পুনর্ব্যক্ত করেন যে বাংলাদেশ সবসময় ‘এক চীন নীতি’র (One China Policy) প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং ভবিষ্যতেও এই অটুট সমর্থন অব্যাহত থাকবে। তিনি ভোলার গ্যাসক্ষেত্রসহ বাংলাদেশের সমগ্র সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চলে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান এবং উত্তোলনে চীনের শীর্ষ বাণিজ্যিক কোম্পানিগুলোকে সরাসরি বিনিয়োগের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানান। এছাড়া ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের (আইপিইউ) এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলের আসন্ন নির্বাচনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি ব্যারিস্টার জহরত আদিব চৌধুরীর প্রার্থিতার পক্ষে চীন সরকারের সমর্থন ও সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন তিনি।
সৌজন্য সাক্ষাতের সময় চীনা দূতাবাসের ঊর্ধ্বতন কূটনীতিকবৃন্দ এবং বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিবসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এস এম সোহাগ ফরাজী