‘আমার নাও যে গাঙ্গে ডুবে না’: বাউলসম্রাট শাহ আব্দুল করিমের প্রয়াণ দিবসে গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি
শাহ তোফাজ্জুল হোসেন ভান্ডারী
প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ বাউল কল্যাণ ফেডারেশন ও বাউল শিল্পী কল্যাণ ট্রাস্ট সিলেট
গীতিকার ও শিল্পী, বাংলাদেশ বেতার
“আমার নাও যে গাঙ্গে ডুবে না ওরে মাঝি খবরদার
খবরদার হুঁশিয়ার নায়ে আছে ছয়জন চকিদার…”
বাউলতত্ত্বের এই গভীর একটি কলিতেই তিনি মানুষের সমগ্র জীবনের গূঢ় দর্শন উন্মোচন করে গেছেন। এখানে ‘নাও’ বা নৌকা হলো নশ্বর মানবদেহ, ‘গাঙ্গ’ হলো তরঙ্গময় এই ভবনদী, আর ‘ছয়জন চকিদার’ হলো কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্যরূপী ষড়রিপু। যে সাধক এই ছয় রিপুর প্রলোভন ও আক্রমণ থেকে আত্মাকে রক্ষা করে নিজের তরী বাইতে পারেন, ভবসাগরে তাঁর নাও কখনো তলিয়ে যায় না।
আজ ১২ সেপ্টেম্বর। মাটি ও মানুষের গানের মহান সাধক, বাউলসম্রাট শাহ আব্দুল করিমের প্রয়াণ দিবস। ২০০৯ সালের এই দিনে তিনি পার্থিব দেহ ত্যাগ করে পরপারে পাড়ি জমান। কিন্তু নশ্বর দেহের অবসান ঘটলেও তিনি রেখে গেছেন অসংখ্য কালজয়ী আধ্যাত্মিক ও গণমুখী গান, যা আজও কোটি বাঙালির অন্তরে নিত্যদিনের সুরঝংকার হয়ে অনুরণিত হয়।
প্রকৃতির সন্তান ও মরমী সাধক
ভাটি অঞ্চলের সুনামগঞ্জের কালনী-সুরমা বিধৌত উজানধল গ্রামে বেড়ে উঠেছিলেন করিম শাহ। হাওরাঞ্চলের উদার জল-হাওয়া এবং শ্যামল প্রকৃতিই তাঁকে বৈরাগ্য ও সাধনাসংগীতে টেনে এনেছিল। রাখাল বেশে বাঁশির সুরেই ব্যাকুল হয়েছিল তাঁর মন-প্রাণ। তিনি ছিলেন বাংলার দেহতত্ত্ব ও মরমী ধারার এক উজ্জ্বলতম ধ্রুবতারা।
বাউল দর্শনের মূল লক্ষ্যই হলো মানবসত্তার ভেতর দিয়ে সেই পরম সত্তার সঙ্গে নিগূঢ় মিলন বা যোগসূত্র স্থাপন করা। আত্মোপলব্ধির পথ ও রূপ ভিন্ন হলেও সাধকদের পরম লক্ষ্য থাকে এক ও অভিন্ন। শাহ আব্দুল করিমও আদি থেকে অন্ত, সৃষ্টির উৎপত্তি থেকে বিনাশের রহস্য সন্ধানে আজীবন আত্মনিবেদন করে গেছেন।
মানুষের কবি, মেহনতির কণ্ঠস্বর
শাহ আব্দুল করিম শুধু বৈরাগ্যের সাধক ছিলেন না; লালন সাঁইজির মতো তিনিও ছিলেন নিখাদ মানুষের কবি। তিনি গেয়েছেন মেহনতি মানুষের জীবনের জয়গান। সুরে সুরে লড়াই করেছেন সমাজের অধিকারবঞ্চিত, শোষিত ও অনগ্রসর প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মুক্তির জন্য।
তাঁর গানের পরতে পরতে ফুটে উঠেছে রোদে পোড়া কৃষকের ঘাম, জালের টানে ক্লান্ত জেলের দীর্ঘশ্বাস আর খেটে খাওয়া মানুষের অব্যক্ত হাহাকার। তিনি কোনোকালে রাজা-বাদশা কিংবা ক্ষমতাধরদের স্তুতি গাননি; আজীবন গেয়েছেন কাদামাটি মাখা সাধারণ মানুষের আকুতি। আর এ কারণেই তিনি গণমানুষের হৃদয় জয় করে হয়ে উঠেছেন চিরভাস্বর “বাউলসম্রাট”।
আজ ১২ সেপ্টেম্বর তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে আমরা কোনো শোক প্রকাশ করতে চাই না; বরং তাঁর সৃষ্টির ভেতর দিয়েই তাঁকে উদ্যাপন করতে চাই। শাহ আব্দুল করিমের মতো কালজয়ী সাধকদের মৃত্যু নেই। যতদিন বাংলার নদ-নদীতে পালতোলা নাও ভাসবে, বাঁশের বাঁশিতে বাউলের আকুল সুর বাজবে, ততদিন তিনি বেঁচে থাকবেন আবহমান বাংলার কোটি মানুষের হৃদয়ে।
বাউলসম্রাট শাহ আব্দুল করিমের স্মৃতির প্রতি আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা।
এস এম সোহাগ ফরাজী