বাউল সমিতি সিলেট জেলা শাখার নতুন কমিটির অভিষেক সম্পন্ন: কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের বিরোধ নিয়ে ক্ষোভ
নিজস্ব প্রতিবেদক, দৈনিক জীবনযাত্রা
সিলেট প্রতিনিধি: শাহ তোফাজ্জুল হোসেন ভান্ডারী
সিলেট:
নানা বিতর্ক ও টানাপোড়েনের মধ্যেই সিলেট মহানগরের তালতলাস্থ সার্প স্টুডিও মিলনায়তনে বাংলাদেশ বাউল সমিতি সিলেট জেলা শাখার নবগঠিত কমিটির জমকালো অভিষেক ও মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬) সন্ধ্যায় এ আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে বক্তারা বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির বৈধতা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং সংগঠনের শীর্ষ পদ দখল ও বাণিজ্যের অভিযোগ তোলেন।
নবনির্বাচিত সভাপতি বাউল শিল্পী লোকমান সরকারের সভাপতিত্বে এবং সংগীতভক্ত ফিরুজ আহমদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ বাউল সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সুনামগঞ্জ জেলা বাউল সমিতির সভাপতি বাউল শিল্পী সালাম নুরী। এছাড়া বক্তব্য রাখেন বাউল শিল্পী জায়েদ সরকার ও বাউল শিল্পী বিন্দু বাবুসহ স্থানীয় প্রবীণ ও নবীন শিল্পীবৃন্দ।
ঘোষিত সিলেট জেলা কমিটি:
অনুষ্ঠানে কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ১ আগস্ট ২০২৬ তারিখে স্বাক্ষরিত সিলেট জেলা শাখার পূর্ণাঙ্গ কার্যকরী কমিটির নাম ঘোষণা করেন। ঘোষিত কমিটির দায়িত্বপ্রাপ্তরা হলেন:
সভাপতি: বাউল শিল্পী লোকমান সরকার
সিনিয়র সহ-সভাপতি ও প্রধান সমন্বয়কারী: ফিরুজ আহমদ ফিরুজ
সহ-সভাপতি: বাউল শিল্পী খুশী নুরী, বাউল শিল্পী মুরাদ আহমদ, বাউল মোশারাফ হোসেন রাশেদ, বাউল শিল্পী দুদু সরকার, গীতিকার এম আকুল, সুনাম মিয়া ও জামাল আহমদ
সাধারণ সম্পাদক: বাউল মানিক মিয়া
সহ-সাধারণ সম্পাদক: গীতিকার আমির উদ্দিন শিহাব
যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক: বাউল শিল্পী জায়েদ সরকার, বাউল মাছুম আহমদ ও বাউল শিল্পী ফারজানা আক্তার
সাংগঠনিক সম্পাদক: বাউল শিল্পী আনোয়ারা বেগম
সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক: বাউল শিল্পী রিপন ঠাঁকুর
অর্থ সম্পাদক: বাউল শিল্পী নিল মিয়া
সাংস্কৃতিক সম্পাদক: বাউল শিল্পী জমির দেওয়ান
মহিলা বিষয়ক সম্পাদক: বাউল শিল্পী নাজমা আক্তার
সহ-মহিলা বিষয়ক সম্পাদক: বাউল শিল্পী পায়রা জালী
দপ্তর সম্পাদক: বাউল শিল্পী চাঁদনি সুমি
প্রচার সম্পাদক: অনিক আহমদ
আপ্যায়ন সম্পাদক: বাউল মিজান আহমদ
সমাজসেবা সম্পাদক: বাউল শিল্পী জাহেদা আক্তার
নির্বাহী সদস্য: বাউল শিল্পী জামিল সরকার, বাউল শিল্পী শাহজাহান খান, বাউল শিল্পী জাহেদা আক্তার ও বাউল পাখি সরকার।
কেন্দ্রীয় কমিটির বিরুদ্ধে বিস্ফোরক অভিযোগ:
অভিষেক সভায় কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নিয়ে বক্তারা চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেন। বক্তারা অভিযোগ করে বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর বর্তমান স্বঘোষিত সভাপতি আব্দুল হালিম (সাগর চাঁন) ও সাধারণ সম্পাদক বাউল বারেক বৈদেশী একটি সুবিধাবাদী চক্র ও ‘মব’ তৈরি করে কেন্দ্রীয় সভাপতি মহারাজ আবুল সরকার ও সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমকে পদত্যাগে বাধ্য করার অপচেষ্টা চালান।
তাঁরা অভিযোগ করেন, নিয়মতান্ত্রিক মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই প্রবীণ শিল্পীদের বাদ দিয়ে এবং সমিতির মূল কার্যালয় এড়িয়ে অবৈধভাবে কমিটি ঘোষণা করে তারা জোরপূর্বক চেয়ার দখল করে আছেন, যা সংগঠনের গঠনতন্ত্র ও সমাজসেবা অধিদপ্তরের সুনির্দিষ্ট বিধিবিধানের চরম লঙ্ঘন। বক্তারা আরও দাবি করেন, মেয়াদোত্তীর্ণ ও অননুমোদিত নেতৃত্ব বর্তমানে অর্থের বিনিময়ে (১০ হাজার টাকার চুক্তিতে) বিভিন্ন জেলায় ভুয়া কমিটি দিয়ে জালিয়াতি ও বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে।
বাউল সমাজের উদ্বেগ:
বক্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অনাকাঙ্ক্ষিত বিভক্তির কারণে আজ দেশজুড়ে বাউল অঙ্গনে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। পাল্টাপাল্টি লাইভ বক্তব্য, ফেসবুক পোস্ট ও প্রকাশ্যে হুমকি দেওয়ার মতো অনভিপ্রেত ঘটনা শিল্পীদের মর্যাদাকে ভূলুণ্ঠিত করছে। বাউল শিল্পীরা দলমত নির্বিশেষে মাটি ও মানুষের কথা বলেন। এই ঐতিহ্যবাহী ধারাকে রাজনৈতিক কাদা-ছোড়াছুড়ি ও ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে রেখে অবিলম্বে সংকট নিরসন না করলে লোকায়ত বাউল সংস্কৃতি ধ্বংসের মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন উপস্থিত শিল্পীরা।
আলোচনা পর্ব শেষে স্থানীয় ও আমন্ত্রিত শিল্পীদের পরিবেশনায় পরিবেশিত হয় আবহমান বাংলার মননশীল বাউল ও আধ্যাত্মিক গান।
এস এম সোহাগ ফরাজী