৮ ডলার নিয়ে যাত্রা শুরু, আজ বিশ্বসেরা ধনকুবের: কে এই সিলেটের সন্তান ড. কেপিসি?
নিজস্ব প্রতিবেদক, দৈনিক জীবনযাত্রা
সিলেট প্রতিনিধি: শাহ তোফাজ্জুল হোসেন ভান্ডারী
সিলেট:
পকেটে ছিল মাত্র ৮ ডলার। চোখে ছিল আকাশছোঁয়া স্বপ্ন আর বুকভরা আত্মবিশ্বাস। প্রতিকূল পরিস্থিতি আর পরিবারের দ্বিমতকে জয় করে শূন্য থেকে শুরু করা সেই তরুণই আজ বৈশ্বিক অর্থনীতির এক প্রভাবশালী মহীরুহ। শুধু বাংলাদেশ বললে ভুল হবে, তিনি এখন বিশ্বের শীর্ষ সারির ধনকুবেরদের একজন। আলোচিত এই শিল্পপতির নাম ডা. কালী প্রদীপ চৌধুরী—আন্তর্জাতিক করপোরেট অঙ্গনে যিনি সংক্ষেপে ‘ড. কেপিসি’ নামেই এক নামে পরিচিত। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে প্রবাসী সিলেটিদের এক বর্ণাঢ্য সংবর্ধনায় যোগ দিয়ে তিনি আবারও নতুন করে সংবাদের শিরোনামে এসেছেন।
ড. কেপিসির জন্ম ও শেকড় সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ঢাকা দক্ষিণ এলাকায়। তাঁর পিতা ছিলেন দানশীল জমিদার কালী প্রসন্ন দত্ত চৌধুরী। শৈশব-কৈশোর সিলেটে কাটানো কালী প্রদীপ ঐতিহ্যবাহী মুরারিচাঁদ (এমসি) কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে চিকিৎসাবিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি ভারতের কলকাতার ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন এবং একজন দক্ষ সার্জন হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলেন।
৮ ডলার থেকে গড়ে তোলা বৈশ্বিক সাম্রাজ্য:
পেশাগত জীবনের একপর্যায়ে পরিবারের অমত থাকা সত্ত্বেও নিজের ভাগ্য গড়ার অদম্য সংকল্প নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান তিনি। সে সময় তাঁর পকেটে সম্বল ছিল মাত্র আটটি মার্কিন ডলার। যুক্তরাষ্ট্রে একজন শল্যচিকিৎসক হিসেবে অল্প দিনেই তাঁর সুনাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। বহু খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব তাঁর অধীনে চিকিৎসা নিতে শুরু করেন। তবে কেবল চিকিৎসা পেশায় নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি তিনি; উদ্যোক্তা হওয়ার ঝুঁকি নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন একটি বিশেষায়িত হেলথকেয়ার প্রতিষ্ঠান। সেই স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের অভাবনীয় সাফল্যই তাঁর ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়ে দেয়। বর্তমানে তিনি বহুমুখী বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ‘কেপিসি গ্রুপ’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান। বিশ্বের অন্তত ২৫টি গুরুত্বপূর্ণ খাতে বিস্তৃত তাঁর ব্যবসা।
বিশ্বজুড়ে কেপিসির বাণিজ্য বলয়:
যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ভারতসহ বিশ্বের ৮টি দেশে কেপিসি গ্রুপের বিশাল সাম্রাজ্য বিস্তৃত। কেবল ভারতেই তাঁর মালিকানায় রয়েছে ১৬টি বিশাল চা-বাগান। ইউক্রেনে তাঁর বিনিয়োগে রয়েছে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে রয়েছে বিলাসবহুল সাত তারকা হোটেল। তাঁর বর্তমান আবাসস্থল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় তিনি একাধিক উপশহর ও আবাসন প্রকল্প গড়ে তুলেছেন। এছাড়া যুক্তরাজ্যের লন্ডনে বিখ্যাত বাকিংহাম প্যালেসের নিকটবর্তী এলাকায় ‘গ্রিন টাউন’ নামে একটি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছেন তিনি।
বাংলাদেশে ১৪২ তলার আইকন টাওয়ারের স্বপ্ন:
মাতৃভূমির উন্নয়ন নিয়ে ড. কেপিসির আগ্রহ দীর্ঘদিনের। ২০১৪ সালে তিনি তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের কাছে রাজধানী ঢাকায় ১৪২ তলাবিশিষ্ট ‘আইকন টাওয়ার’ নির্মাণের এক রূপরেখা প্রস্তাব করেছিলেন। আইফেল টাওয়ার কিংবা বুর্জ খলিফার আদলে পরিকল্পিত এই ভবনটি নির্মিত হলে তা হতো তৎকালীন বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আকাশচুম্বী ভবন। প্রকল্পটির প্রস্তাব সে সময় দেশ-বিদেশের গণমাধ্যমে বিপুল আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।
সিলেটের জন্য বড় উদ্যোগের প্রতিশ্রুতি:
গত ১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশন অব ক্যালিফোর্নিয়া ইনক আয়োজিত এক সংবর্ধনা সভায় প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী ড. কেপিসিকে বাংলাদেশে বিশ্বমানের একটি আধুনিক হাসপাতাল গড়ে তোলার জোরালো আহ্বান জানান এবং সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের জমি ও প্রশাসনিক সহায়তার নিশ্চয়তা দেন।
এর জবাবে ড. কেপিসি আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, “সিলেটের মাটি ও মানুষের সঙ্গে আমার নাড়ির টান। শেকড়ের মানুষের জন্য বড় কিছু করতে আমি সবসময় আন্তরিকভাবে প্রস্তুত। সিলেটে বিশ্বমানের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতের পাশাপাশি লস অ্যাঞ্জেলেসে জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশনের নিজস্ব স্থায়ী ভবন নির্মাণেও আমি পূর্ণ আর্থিক সহযোগিতা করব।”
কঠোর অধ্যবসায়, সততা আর অদম্য মানসিকতা নিয়ে কীভাবে শূন্য থেকে বিশ্বের শিখরে পৌঁছানো যায়—সিলেটের কৃতী সন্তান ডা. কালী প্রদীপ চৌধুরী আজ বিশ্বমঞ্চে বিশ্ব বাঙালির এক উজ্জ্বলতম প্রেরণার প্রতীক।
এস এম সোহাগ ফরাজী