বাংলাদেশ বাউল সমিতির সাবেক কমিটির কাছে ৫২ লাখ টাকা পাওনা, দাবি বর্তমান সভাপতি আব্দুল হালিম সাগর চাঁন
নিজস্ব প্রতিবেদক, দৈনিক জীবনযাত্র: ঢাকা/সিলেট:
বাংলাদেশ বাউল সমিতির চলমান নেতৃত্ব সংকট ও সাংগঠনিক বিতর্ক নিয়ে এবার খোলামেলা ও কড়া বক্তব্য দিয়েছেন বর্তমান কেন্দ্রীয় সভাপতি আব্দুল হালিম (সাগর চাঁন)। তিনি দাবি করেছেন, সমাজসেবা অধিদপ্তরের সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা ও বিধিমোতাবেকই সারা দেশে জেলা ও থানা কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি সাবেক কমিটির শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে বিগত ১৫ বছরের আয়-ব্যয়ের হিসাব আটকে রাখা এবং সমিতির তহবিলের প্রায় ৫২ লাখ টাকা আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন।
শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬) এক বিশেষ বক্তব্যে আব্দুল হালিম সাগর চাঁন বর্তমান কমিটির অবস্থান পরিষ্কার করে এসব তথ্য তুলে ধরেন।
কমিটির বৈধতা ও সমাজসেবার তদন্ত:
বর্তমান কমিটির বৈধতা প্রসঙ্গে সাগর চাঁন বলেন, “আমাদের সাংগঠনিক সব কার্যক্রম শতভাগ নিয়মতান্ত্রিক ও স্বচ্ছ। সমাজসেবা অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুসরণ করে সারা দেশে জেলা ও থানা কমিটিগুলো সাজানো হয়েছে। ইতিমধ্যে সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে একটি চিঠি ইস্যু করে তদন্তের মাধ্যমে আমাদের চূড়ান্ত প্রশাসনিক স্বীকৃতি দেওয়ার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া চলছে।” তিনি জোর দিয়ে বলেন, বর্তমান কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অনুমোদন ছাড়া সারা দেশে বাউল সমিতির নামে গঠিত কোনো কমিটি কার্যকর বা বৈধ হবে না। এ বিষয়ে বিভ্রান্ত না হতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
১৫ বছরের হিসাব ও ৫২ লাখ টাকার পাওনা:
সাবেক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ এনে সভাপতি বলেন, “বিগত কমিটির সভাপতি মহারাজ আবুল সরকার, সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ও কোষাধ্যক্ষের কাছে বিগত ১৫ বছরের হিসাব বাবদ বাউল সমিতির প্রায় ৫২ লাখ টাকা বকেয়া ও পাওনা রয়েছে। তাঁরা এখন পর্যন্ত সেই হিসাব বুঝিয়ে দেননি।”
তিনি জানান, দীর্ঘদিনের এই হিসাব ও পাওনা অর্থ আদায়ে সাবেক সভাপতি আবুল সরকারের নামে ইতিমধ্যে লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো হয়েছে। পাওনা টাকার হিসাব চাওয়ায় তাঁকে বিভিন্ন মহল থেকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে দাবি করে তিনি জানান, এ ঘটনায় রাজধানীর শাহ আলী থানায় একটি লিখিত সাধারণ ডায়েরি ও অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
‘প্রতিষ্ঠাতা সদস্য একজনই, অন্যরা ধ্বংসের পাঁয়তারা করছে’:
সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য পদ দাবি নিয়ে সাগর চাঁন বলেন, “বাংলাদেশ বাউল সমিতির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ছিলেন মরহুম শাহজাহান সাদুল্লাপুরী ভান্ডারী। তিনি একাই ছিলেন ফাউন্ডার মেম্বার। সংবিধানে দ্বিতীয় কোনো প্রতিষ্ঠাতা সদস্যের অস্তিত্ব নেই। এখন যাঁরা মনগড়া প্রতিষ্ঠাতা সদস্য দাবি করে বিশৃঙ্খলা করছেন, তাঁরা মূলত সমিতিটিকে ধ্বংস করার সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত।”
আওয়ামী লীগের দোসরদের ঠাঁই নেই:
সংগঠনের অতীত তুলে ধরে তিনি বলেন, তিনি নিজেও এই সংগঠনের একজন নিয়মিত আজীবন সদস্য ছিলেন এবং পূর্বে গণতান্ত্রিকভাবে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পরবর্তীতে সমাজসেবা অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী সমিতির সাধারণ সভা আহ্বান করা হলে উপস্থিত সকল বাউল শিল্পীর সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে তাঁকে সভাপতি নির্বাচিত করে বর্তমান কার্যকরী কমিটি গঠন করা হয়। সাবেক কমিটিকে ‘আওয়ামী লীগের দোসর’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, “বিগত স্বৈরাচারী শাসনের দোসর হিসেবে যারা কাজ করেছে, বর্তমান সরকার কিংবা সমাজসেবা অধিদপ্তর কোনোভাবেই তাদের অবৈধ তৎপরতাকে স্বীকৃতি দেবে না।”
রাজনীতিমুক্ত সংগঠন ও পদ ছাড়ার উন্মুক্ত চ্যালেঞ্জ:
বাউল সমিতিকে সম্পূর্ণ দলনিরপেক্ষ, অলাভজনক ও সামাজিক সংগঠন হিসেবে উল্লেখ করে আব্দুল হালিম সাগর চাঁন বিরোধীদের উদ্দেশে উন্মুক্ত আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “দূর থেকে বসে অপপ্রচার ও বিভ্রান্তিকর সমালোচনা না করে সরাসরি আমাদের কাছে আসুন, আমাদের কোনো ত্রুটি থাকলে তা ধরিয়ে দিন। আপনারা যদি নিয়মতান্ত্রিকভাবে আমাদের চেয়ে অধিকতর যোগ্য প্রমাণিত হন, তবে আমরা আনন্দের সঙ্গে পদ ছেড়ে দেবো—আপনারা এই সমিতি পরিচালনা করুন। কিন্তু ঐতিহ্যবাহী বাউল সমাজকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেবেন না।”
এস এম সোহাগ ফরাজী।