সংস্কৃতিচর্চায় ক্রমাগত বাধা ও আতঙ্কের আবহ: বন্ধের সংস্কৃতি নিয়ে শিল্পী-সংস্কৃতিকর্মীদের গভীর উদ্বেগ
বিশেষ প্রতিবেদন: গান হবে, শিল্পীরা মঞ্চে উঠবেন এবং দর্শক-শ্রোতারা আনন্দ উপভোগ করবেন—সাংস্কৃতিক আয়োজনের এই আবহমান ও স্বাভাবিক চিত্র সাম্প্রতিক সময়ে বদলে গিয়ে তৈরি হয়েছে চরম অনিশ্চয়তা আর ভীতিকর পরিস্থিতি। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কনসার্ট, বাউলগানের আসর, মঞ্চনাটক, এমনকি ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচের মতো লোকজ আয়োজনও ধর্মীয় অনুভূতি ও বিভিন্ন গোষ্ঠীর আপত্তির মুখে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এতে শিল্পী, সংগঠক ও সাধারণ দর্শকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে গভীর উদ্বেগ ও আত্মসংকোচন।
কনসার্ট থেকে লোকসংস্কৃতি: বাধার দীর্ঘ তালিকা
সাম্প্রতিক নানা ঘটনায় দেখা যাচ্ছে, কোনো গোষ্ঠী আপত্তি তুললেই প্রশাসন অনেক ক্ষেত্রে সংঘাত এড়াতে অনুষ্ঠান বাতিল বা শর্ত জুড়ে দিচ্ছে।
কনসার্ট বাতিল ও পুলিশের অনুষ্ঠানে হামলা: গত ১৯ আগস্ট কিশোরগঞ্জে ব্যান্ড অ্যাশেজ ও গায়ক নোবেলের কনসার্ট স্থানীয় ইমাম-ওলামা পরিষদের আপত্তির মুখে জেলা প্রশাসন বাতিল করে। এর ঠিক আগের দিন ১৮ আগস্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জেলা পুলিশের নিজস্ব সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
লোকজ ঐতিহ্য ও বাউল আসরে আঘাত: সিলেটের বিশ্বনাথে ইব্রাহিম শাহের মাজারসংলগ্ন বাউলগানের আসরে ভাঙচুর করে অনুষ্ঠান পণ্ড করে দেওয়া হয়। নেত্রকোনার মদনেও একই ধরনের বাধা আসে।
নৌকাবাইচ নিয়েও আপত্তি: সিলেটের বিয়ানীবাজারে ২৮ আগস্টের নির্ধারিত ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ বন্ধের দাবি তুলেছে ‘তৌহিদী জনতা’। অন্যদিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নৌকাবাইচের অনুমতি মিললেও সাউন্ড সিস্টেম ও বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে আনন্দ প্রকাশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
জাতীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মাসে ‘তৌহিদী জনতা’র ব্যানারে অন্তত ১১টি আয়োজনে বাধা দেওয়া হয়েছে এবং ধর্মীয় অনুভূতির অভিযোগ তুলে আরও ৩৬টি আয়োজন বন্ধ বা বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে।
শিল্পী ও নাট্যজনদের ক্ষোভ ও আহ্বান
সাংস্কৃতিক অঙ্গনের শীর্ষ ব্যক্তিত্বরা এ পরিস্থিতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করে সমাধান দাবি করেছেন:
মামুনুর রশীদ: “আপত্তি উঠলেই বন্ধ না করে সমাধানের পথ খুঁজতে হবে। সংস্কৃতিচর্চা বন্ধ হলে তরুণ সমাজ বিপথে যাবে এবং দেশ পিছিয়ে পড়বে।”
রামেন্দু মজুমদার: “সংস্কৃতিচর্চায় বাধা জাতির জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে না। সবার নিরবচ্ছিন্ন সংস্কৃতিচর্চার সুযোগ অবারিত রাখতে হবে।”
অনন্ত হীরা: “একটি গোষ্ঠী সংস্কৃতিচর্চাকে স্তব্ধ করার চেষ্টা করছে, যা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। সরকারের স্পষ্ট অবস্থান প্রয়োজন।”
হামিন আহমেদ: “আপত্তি ওঠামাত্র অনুষ্ঠান বাতিল নয়, বরং আয়োজক ও দর্শকের পূর্ণ নিরাপত্তা দিয়ে অনুষ্ঠান সম্পন্ন করাই প্রশাসনের মূল দায়িত্ব।”
আসিফ আকবর: “দেশে গান-বাজনা হবে কিনা সরকারকে তা স্পষ্ট করতে হবে। শিল্পী হিসেবে আমার মুখ কখনও বন্ধ হবে না।”
আত্মসংকোচনের পথে সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রের দায়
বিশ্লেষকদের মতে, সরাসরি হামলার চেয়েও হামলার ভয় ও অনিশ্চয়তা সংস্কৃতিচর্চাকে ভেতর থেকে সংকুচিত করছে। আয়োজক, হলমালিক ও শিল্পীরা প্রতিনিয়ত অজানা শঙ্কায় ভুগছেন।
ইউনেস্কো স্বীকৃত বাউলগানসহ ভাটিয়ালি, জারি-সারি, যাত্রা, পালাগান ও নাটকের মতো বহুত্ববাদী সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) উল্লেখ করেছে, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সমালোচনা বা ভিন্নমত পোষণের অধিকার সবার রয়েছে; কিন্তু ভয়ভীতি, হুমকি বা বেআইনি চাপে আয়োজন বন্ধ করা আইনের শাসনের পরিপন্থী।