‘আমার দেশ’ ছেঁড়ায় যারা বিপর্যয় দেখছেন, ‘প্রথম আলো’ পোড়ানোর সময় তারা কোথায় ছিলেন?: সুশীলদের দ্বিচারিতা নিয়ে আনিস আলমগীরের তোপ
রাজনৈতিক প্রতিবেদক:
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খান ক্ষোভ প্রকাশ করে ‘দৈনিক আমার দেশ’ পত্রিকা ছিঁড়ে ফেলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র আলোড়ন ও বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। একশ্রেণির সুশীল সমাজ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ঘটনাটিকে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ওপর ‘চরম আঘাত’ হিসেবে চিত্রায়িত করার চেষ্টা করছেন।
তবে এই কথিত সমালোচকদের অবস্থানকে চরম রাজনৈতিক সুবিধাবাদ ও দ্বিচারিতা (Selective Outrage) আখ্যা দিয়ে কড়া জবাব দিয়েছেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আনিস আলমগীর।
আজ রবিবার (১ নভেম্বর ২০২৬) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক দীর্ঘ বিশ্লেষণী মন্তব্যে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন—মাত্র কয়েক মাস আগে যখন রাজপথে উৎসব করে ‘প্রথম আলো’ পত্রিকা পোড়ানো হয়েছিল এবং কার্যালয়ে হামলা-অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনা ঘটেছিল, তখন আজকের এই ‘গণতন্ত্রের পাহারাদাররা’ কোথায় ছিলেন?
‘১৬ বছর কোথায় ছিলেন?’-এর জবাবে আনিস আলমগীরের পাল্টা প্রশ্ন:
আনিস আলমগীর তাঁর বক্তব্যে জুলাই-আগস্ট পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতির উল্লেখ করে বলেন, “গত ৫ আগস্টের পর রাষ্ট্রের কোনো অনাচার কিংবা ভুলভ্রান্তি নিয়ে কেউ কথা বললেই একশ্রেণির লোক বা টোকাই প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়—‘১৬ বছর কোথায় ছিলেন?’ আজ তাদেরই ভাষায় পাল্টা প্রশ্ন করতে চাই—যখন প্রকাশ্য রাজপথে একটি পত্রিকা জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তখন আপনারা কোথায় ছিলেন?”
তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, “যাদের মুখে আজ গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে এত বুলি, মাত্র কয়েক মাস আগে যখন পলাতক কিছু ইউটিউবার ও একটি নির্দিষ্ট মহলের আহ্বানে প্রকাশ্য রাজপথে উৎসব করে ‘প্রথম আলো’ পোড়ানো হলো, পত্রিকা কার্যালয়ের সামনে গরু জবাই করা হলো, এমনকি অফিসে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হলো—তখন এই সুশীলদের কণ্ঠ কোথায় স্তব্ধ হয়ে ছিল?”
প্রতীকী প্রতিবাদ আর কার্যালয়ে হামলা এক নয়:
পত্রিকাটির প্রতি ক্ষোভ এবং রাশেদ খানের পদক্ষেপের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে এই সাংবাদিক লেখেন, “‘আমার দেশ’ পত্রিকার ভূমিকা বা সম্পাদকীয় সাংবাদিকতা নিয়ে অনেকের চরম আপত্তি, ক্ষোভ ও অসন্তোষ থাকতেই পারে। কিন্তু একজন নাগরিক বা রাজনৈতিক নেতার নিজের টাকায় কেনা একটি পত্রিকা ছিঁড়ে ফেলে নিজের অসন্তোষ প্রকাশ করা আর একটি পত্রিকার কার্যালয়ে গিয়ে সশরীরে হামলা, ঘেরাও করে গরু জবাই, উৎসব করে পত্রিকা পোড়ানো কিংবা ভবনে আগুন দেওয়ার মতো ফৌজদারি অপরাধ কোনোভাবেই এক পাল্লায় মাপা যায় না।”
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “রাশেদ খান তো কাউকে ‘আমার দেশ’ পত্রিকা পোড়াতে, পত্রিকাটির কোনো অফিসে হামলা চালাতে কিংবা ভবনে আগুন দিতে আহ্বান জানাননি। তিনি কেবল নিজের ক্ষোভের প্রতীকী বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন।”
বাছাই করা প্রতিবাদ ও ভণ্ডামির অবসান দাবি:
একটি অহিংস প্রতীকী প্রতিবাদে যারা হুট করে গণতন্ত্রের মহাবিপর্যয় দেখতে পাচ্ছেন, অথচ অতীতে ঘটে যাওয়া আরও ভয়ংকর ধ্বংসাত্মক ঘটনায় মুখে কুলুপ এঁটেছিলেন—তাদের এই অবস্থানকে ‘রাজনৈতিক সুবিধাবাদ’ বলে আখ্যা দেন আনিস আলমগীর।
তিনি লেখেন, “নিজেদের পছন্দের দল, ব্যক্তি বা মতাদর্শের ওপর সামান্যতম আঁচ লাগলেই হুট করে গণতন্ত্রের ঠিকাদার সেজে বসা যায় না। রাজনীতিতে মত ও পথের ভিন্নতা, পছন্দ-অপছন্দ থাকতেই পারে; কিন্তু অন্যায়ের মাপকাঠি তো আর দলভেদে কিংবা মতভেদে ভিন্ন হতে পারে না। অতীতে যা অন্যায় ও নিন্দনীয় ছিল, আজও তা সমানভাবে অন্যায়। নিজের দলের বেলায় এক নীতি আর প্রতিপক্ষের বেলায় আরেক নীতি—এই নীতিহীন দ্বিচারিতা ও ভণ্ডামি বন্ধ না হলে দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির গুণগত পরিবর্তন কখনোই সম্ভব নয়।”
সবশেষে সব ধরনের হিংসাত্মক কর্মকাণ্ড পরিহারের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “যেকোনো মতাদর্শের সংবাদমাধ্যমই হোক না কেন—গণমাধ্যমের ওপর হামলা, কার্যালয়ে আগুন দেওয়া কিংবা পেশাদার সাংবাদিকদের ওপর শারীরিক আক্রমণ কোনো সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। সুস্থ গণতন্ত্রে মতের বিরোধিতা হতে হবে যুক্তি, বিতর্ক ও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের মাধ্যমে, কোনো সহিংসতা বা ধ্বংসযজ্ঞ দিয়ে নয়।”
এস এম সোহাগ ফরাজী