ধর্ম প্রচারে আজগুবি বিজ্ঞান পরিহার ও টাকনুর নিচে কাপড় পরার আসল বিধান: সৈয়দ গোলাম কিবরিয়া আজহারী
ধর্ম ও জীবন ডেস্ক | দৈনিক জীবনযাত্রা:
কুরআন ও হাদিসের বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা দেওয়ার নামে কিছু ধর্মীয় বক্তা বা হুজুরদের বৈজ্ঞানিক জ্ঞানহীন ও আজগুবি বক্তব্য দেওয়ার প্রবণতা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ সৈয়দ গোলাম কিবরিয়া আজহারী। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিশেষ নিবন্ধে তিনি এই বিষয়ে আলোকপাত করেন। একই সাথে পুরুষদের টাকনু বা পায়ের গিড়ার নিচে কাপড় ঝুলিয়ে পরার ইসলামি বিধান (হুকুম) চার মাজহাবের ফিকহ শাস্ত্রের আলোকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেছেন তিনি।
তিনি বলেন, কুরআন-হাদিসে বহু বৈজ্ঞানিক সত্য (ই’জাযুল কুরআন) রয়েছে যা মানুষের ইমান তাজা করে। কিন্তু বিজ্ঞান সম্পর্কে ন্যূনতম জ্ঞান না রেখে কিছু বক্তা যখন আজগুবি কথা বলেন, তখন আধুনিক ও শিক্ষিত সমাজে ইসলামকে উপহাসের পাত্র বানানো হয়।
টাকনুতে সেক্স হরমোন থাকার দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন
সৈয়দ গোলাম কিবরিয়া আজহারী তাঁর লেখায় একটি বহুল প্রচলিত ও ভাইরাল হওয়া দাবির কথা উল্লেখ করে বলেন,
“কিছু হুজুরকে ওয়াজে বলতে শুনেছি এবং ফেসবুকেও লেখা হয়েছে যে—টাকনুতে সেক্স হরমোন থাকে এবং টাকনু গিড়া খোলা রাখলে তাতে বাতাস লেগে বায়োলজিক্যাল উপকার হয়। অথচ জীববিজ্ঞানের (বায়োলজি) কোনো বইয়ে দূর-দূরান্তেও এমন কোনো তথ্যের অস্তিত্ব নেই।”
তিনি যুক্তি দিয়ে বলেন, টাকনুতে বাতাস লাগলেই যদি হরমোন নিঃসরণ হতো, তবে প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নিয়মিত আমল ছিল চামড়ার মোজা (খুফফাইন) দিয়ে টাকনু ঢেকে রাখা। মোজা পরে থাকলে তো টাকনুতে বাতাস লাগার সুযোগ ছিল না। সুতরাং, বানোয়াট ও আজগুবি কথা বলে ইসলামকে জোর করে সস্তা বৈজ্ঞানিক প্রমাণের কোনো প্রয়োজন নেই, কারণ ইসলাম এমনিতেই বিজ্ঞানসম্মত।
টাকনুর নিচে কাপড় পরার মূল কারণ: জাহেলি যুগের অহংকার
আজহারী তাঁর বিশ্লেষণে স্পষ্ট করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জামানায় বা প্রাক-ইসলামি জাহেলি যুগে আরবের ধনী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা অহংকার, শৌর্য-বীর্য ও দম্ভ প্রদর্শনের জন্য মাটির সঙ্গে কাপড় ঝুলিয়ে বা টেনে চলতেন। মূলত এই অহংকার ও দম্ভের মানসিকতা দূর করতেই রাসূলুল্লাহ (সা.) পুরুষদের টাকনুর নিচে কাপড় ঝুলিয়ে পরতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন।
চার মাজহাবের ফুকাহায়ে কেরামদের মতামতের বিশ্লেষণ
ইসলামি আইনবেত্তা বা ফুকাহায়ে কেরামদের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি জানান, অহংকারবশত (الخيلاء) টাকনুর নিচে কাপড় ঝুলিয়ে পরা সর্বসম্মতভাবেই হারাম এবং কবিরা গুনাহ। তবে অহংকার ছাড়া বা অবহেলাবশত যদি কাপড় টাকনুর নিচে যায়, তবে তা হারাম হবে কি না, তা নিয়ে মাজহাবগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে এবং চার মাজহাবের অধিকাংশ ফকিহ একে ‘হারাম’ বলেননি।
হানাফি মাজহাব: ইমাম আজম আবু হানিফা (রহ.)-কে একবার মাটিতে কাপড় ঝুলিয়ে চলতে দেখে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, “আমাদের কি এ কাজ থেকে নিষেধ করা হয়নি?” তিনি জবাব দিয়েছিলেন, “নিশ্চয়ই তা অহংকারবশত কাপড় ঝুলিয়ে যারা চলে তাদের ব্যাপারে, আমরা তো তাদের অন্তর্ভুক্ত নই।” (আদাবুশ শরীয়াহ, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫২১; ফতোয়া আল হিন্দিয়া, ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৩৩)।
শাফেয়ী মাজহাব: ইমাম নববী তাঁর ‘আল-মাজমু’ কিতাবে লিখেছেন—ইমাম শাফেয়ী (রহ.)-এর মতে, নামাজে এবং নামাজের বাইরে সর্বাবস্থায় অহংকারবশত টাকনুর নিচে কাপড় পরা হারাম, কিন্তু অহংকার ছাড়া ঝুলিয়ে পরায় কোনো অসুবিধা বা গুনাহ নেই।
হাম্বলী মাজহাব: ইমাম ইবনে কুদামাহ আল হাম্বলী তাঁর বিখ্যাত ‘আল মুগনী’ কিতাবে লিখেছেন, জামা বা পায়জামা (অহংকার ছাড়া) টাকনুর নিচে পরা মাকরুহ, আর অহংকারবশত হলে তা হারাম। এমনকি বিখ্যাত আলিম ইবনে তাইমিয়্যাহ-ও একে হারাম বলেননি (শরহুল উমদা, পৃষ্ঠা ৩৬১-৩৬২)।
মালেকি মাজহাব: হাফিজ ইবনু আব্দিল বার তাঁর ‘তামহিদ’ কিতাবে বলেছেন, হাদিস অনুযায়ী অহংকার ছাড়া যারা কাপড় ঝুলিয়ে চলবে তারা ওই কঠোর শাস্তির অন্তর্ভুক্ত নয়, তবে এটি ভালো কাজ নয় (মাকরুহ)।
তবে সমসাময়িক কিছু আলিম (যাঁদের অনেকে হাম্বলী মাজহাবের দাবিদার বা লা-মাজহাবী) যেমন শায়খ ইবনে উসাইমিন ও বিন বাজ সাহেব সর্বাবস্থায় একে হারাম বলেছেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
পরিশেষে, বুখারী শরীফের ‘পোশাক পরিচ্ছদ’ অধ্যায়ের হাদিসগুলোর বরাত দিয়ে সৈয়দ গোলাম কিবরিয়া আজহারী সকলকে বানোয়াট ও মনগড়া বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা থেকে বিরত থেকে ফিকহ ও হাদিসের সঠিক মর্মার্থ অনুধাবন করার আহ্বান জানান।
এস এম সোহাগ ফরাজী