দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে বাউল শিল্পীকে কান ধরিয়ে ওঠবস ও গ্রামছাড়া করার হুমকি: মানহানির অভিযোগ রফিক দেওয়ানের
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা | দৈনিক জীবনযাত্রা:
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে স্বাধীন মতামত প্রকাশ এবং বাউল সংস্কৃতি চর্চাকে কেন্দ্র করে ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে এক প্রবীণ বাউল শিল্পীকে সামাজিকভাবে চরম হেনস্তা, কান ধরিয়ে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করা এবং এলাকা ছাড়ার হুমকি দেওয়ার এক ন্যক্কারজনক অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী ওই বাউল শিল্পীর নাম মোঃ রফিক দেওয়ান, যিনি দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের পূর্ব জাজিরা গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা।
ধর্মীয় লেবাসধারী উগ্রবাদী চক্রের মিথ্যা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে এলাকায় সালিশি বৈঠক বসিয়ে তাঁর মান-সম্মান ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং তাঁর ব্যক্তিগত ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার ওপর চরম আঘাত হানা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন এই লোকসংগীত শিল্পী।
ফেসবুকে পোস্ট ও বাউল গানের অনুমতি বাতিলের দাবি
ঘটনার সূত্রপাত বাউল শিল্পী রফিক দেওয়ানের ফেসবুকের কিছু লেখালেখি এবং বাউল সংস্কৃতির পক্ষে অবস্থান নেওয়াকে কেন্দ্র করে। তিনি দাবি করে আসছিলেন যে, বাঙালির ঐতিহ্যবাহী বাউল গান পরিবেশন করার জন্য থানা থেকে কেন পারমিশন বা অনুমতি নিতে হবে? একই সাথে কোনো এলাকার উগ্রবাদী চক্র যদি কোনো প্রগতিশীল মানুষের বিরুদ্ধে থানায় গিয়ে মিথ্যা বা বানোয়াট তথ্য দেয়, তবে তদন্ত সাপেক্ষে সেই মিথ্যা তথ্যদাতাকেই যেন পুলিশ গ্রেফতার করে।
এর পাশাপাশি সমাজে চলমান ধর্মীয় লেবাসধারী কিছু অপরাধীর বিকৃত মানসিকতা, নারী নির্যাতন এবং নিষ্পাপ শিশুদের ওপর বলাৎকারের (শিশু নির্যাতন) তীব্র সমালোচনা করে ফেসবুকে সরব ছিলেন তিনি। ইসলামের ইতিহাসে শিশুদের ওপর পাশবিক নির্যাতনকারী ‘কওমে লুত’-এর অবাধ্য আচরণের সাথে বর্তমানের কিছু ভণ্ড ও বিকৃত চরিত্রের মানুষের তুলনা করাই যেন তাঁর জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়।
জোরপূর্বক কান ধরিয়ে ক্ষমা প্রকাশ ও গান-বাজনায় নিষেধাজ্ঞা
বাউল শিল্পী রফিক দেওয়ান অত্যন্ত ক্ষোভ ও কান্নাবিজড়িত কণ্ঠে জানান, তাঁর এই প্রগতিশীল ও প্রতিবাদী অবস্থানের কারণে পূর্ব জাজিরা এলাকার কিছু প্রভাবশালী ও সংকীর্ণমনা ব্যক্তি তাঁর বিরুদ্ধে অন্যায়ভাবে সালিশি বৈঠক বসায়। সালিশে রফিক দেওয়ান বলেন—
“আমি কোনো অপরাধ না করেও পরিস্থিতির শিকার হয়ে সবার কাছে হাত জোড় করে ক্ষমা চেয়েছিলাম। কিন্তু নিষ্ঠুর সালিশকারীরা তাতেও ক্ষান্ত হয়নি। তারা আমাকে সবার সামনে জোরপূর্বক কান ধরিয়ে ওঠবস করিয়ে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করেছে। আমি নিরুপায় হয়ে নিজের ইজ্জত বাঁচাতে কানে ধরে ক্ষমা চেয়েছি।”
এখানেই শেষ নয়, সালিশি বৈঠক থেকে ওই বাউল শিল্পীকে কঠোরভাবে ফতোয়া দেওয়া হয়েছে যে—তিনি তাঁর নিজের বাড়িতে আর কোনো দিন গান-বাজনা করতে পারবেন না এবং ফেসবুকে গান বা কোনো প্রকার লেখালেখি করতে পারবেন না। এটি সরাসরি একজন নাগরিকের সাংবিধানিক ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপ।
মিথ্যা অপবাদ ও মানহানির শিকার
রফিক দেওয়ান ক্ষোভ প্রকাশ করে আরও জানান, তাঁকে সামাজিকভাবে একদম একঘরে ও হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য কুচক্রী মহলটি এলাকায় রটিয়েছে যে—তিনি নাকি মদ, গাঁজাসহ নানা ধরনের মরণনেশায় আসক্ত। অথচ তিনি জীবনে একটি সিগারেটও ছুঁয়ে দেখেননি। এই মিথ্যা ও বানোয়াট অপবাদের কারণে সমাজে তাঁর দীর্ঘদিনের উপার্জিত মান-সম্মান ও ক্যারিয়ার সম্পূর্ণ ধ্বংসের মুখে পড়েছে।
এই ঘটনার পর থেকে ওই বাউল শিল্পী চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। তিনি দেশের প্রগতিশীল সমাজ, প্রশাসন এবং লোকসংস্কৃতি প্রেমীদের কাছে এই অন্যায় সালিশ, ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ এবং হেনস্তাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
এস এম সোহাগ ফরাজী।