রায়পুরে একই পরিবারের চার সদস্য নিহত, অভিযুক্তও মারা গেছে; নিহতের সংখ্যা ৫
লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে একই পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার মর্মান্তিক ঘটনায় গুরুতর আহত অবস্থায় থাকা কিশোরী ইকরা আক্তারও মারা গেছে। এতে একই পরিবারের চারজনসহ মোট নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে পাঁচজনে। অন্যদিকে হামলার অভিযোগে আটক যুবক অন্তর মজুমদারও গণপিটুনিতে আহত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছেন।
বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) বিকেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইকরা আক্তারের মৃত্যু হলে বিষয়টি নিশ্চিত করেন লক্ষ্মীপুরের পুলিশ সুপার মো. আবু তারেক এবং রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. বাহারুল আলম।
নিহতরা হলেন শাহিনুর বেগম (৩৮), তার বড় মেয়ে সায়মা আক্তার (২১), মেজ মেয়ে ইকরা আক্তার (১৭) এবং ছোট মেয়ে শিফা আক্তার (৯)। সায়মা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। এছাড়া গণপিটুনিতে নিহত অভিযুক্ত যুবক অন্তর মজুমদার নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার বাসিন্দা এবং রায়পুরে ভ্রাম্যমাণ ফল ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে জানা গেছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শাহিনুর বেগমের পরিবারের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লায় হলেও তারা দীর্ঘ ১২ থেকে ১৪ বছর ধরে রায়পুর পৌরসভার গোডাউন রোড এলাকায় বসবাস করছিলেন। কয়েক বছর আগে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে স্বামী মো. কামালের মৃত্যু হলে সন্তানদের নিয়ে একাই সংসার চালিয়ে আসছিলেন তিনি।
বৃহস্পতিবার সকালে তাদের ভাড়া বাসায় ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলা চালানো হয়। এতে শাহিনুর বেগম, তার তিন মেয়ে এবং অভিযুক্ত অন্তর মজুমদার গুরুতর আহত হন। স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা শাহিনুর, সায়মা ও শিফাকে মৃত ঘোষণা করেন।
গুরুতর আহত ইকরাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়ার পথে তার অবস্থার অবনতি ঘটে। পরে তার মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। এতে একই পরিবারের চার সদস্যের প্রাণহানির ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ঘটনার পর স্থানীয়রা সন্দেহভাজন হিসেবে অন্তর মজুমদারকে আটক করে গণপিটুনি দেয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তারও মৃত্যু হয়।
এ ঘটনায় এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ মোতায়েন করা হয়। বিক্ষুব্ধ জনতার ছোড়া ইটপাটকেলে অন্তত ৬ থেকে ৭ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
নিহত পরিবারের একমাত্র ছেলে সিফাত হোসেন স্থানীয় একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। ঘটনার সময় তিনি কর্মস্থলে ছিলেন। পরিবারের সদস্যদের মৃত্যুর খবর পেয়ে তিনি চরম মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন বলে জানিয়েছেন তার সহকর্মীরা।
সিফাতের নিয়োগকর্তা ও স্থানীয় ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম মুরাদ বলেন, “সকালে কাজে আসার কারণে সিফাত কিছুই জানতেন না। পরে খবর পেয়ে তিনি চরম মানসিক আঘাতের মধ্যে পড়েন এবং স্বাভাবিকভাবে কারও সঙ্গে কথা বলার অবস্থায় নেই।”
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, অন্তর মজুমদার একসময় তার স্ত্রীকে নিয়ে ওই এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন। প্রায় সাত থেকে আট মাস আগে তিনি সেখান থেকে চলে যান। তবে পূর্ব পরিচয়ের সূত্র ধরে তিনি ঘটনাস্থলে আসতে পেরেছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পুলিশ সুপার মো. আবু তারেক জানান, ঘটনার দিন সকালে অন্তরকে বাড়ির সামনে দেখে এক প্রতিবেশী তার কাছে আসার কারণ জানতে চাইলে তিনি পানির পাইপ মেরামতের কথা বলেন। বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হওয়ায় ওই প্রতিবেশী বাড়ির কলাপসিবল গেট বন্ধ করে স্থানীয়দের খবর দেন। এতে ঘটনাটি দ্রুত প্রকাশ্যে আসে।
তবে কী কারণে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, সে বিষয়ে এখনও নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।
স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. বাহারুল আলম জানান, হাসপাতালে মোট পাঁচজনকে গুরুতর আহত অবস্থায় আনা হয়েছিল। তাদের মধ্যে শাহিনুর বেগম ও তার দুই মেয়ে প্রথমে মারা যান। পরে ঢাকায় নেওয়ার পথে ইকরার মৃত্যু হয়। অপরদিকে গণপিটুনিতে আহত অন্তর মজুমদারও চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রাণ হারান।
এই মর্মান্তিক ঘটনায় পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। একই পরিবারের চার সদস্যের মৃত্যু এবং পরবর্তীতে অভিযুক্তের মৃত্যুর ঘটনায় রায়পুরজুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। তদন্ত শেষে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ ও পেছনের রহস্য উদঘাটিত হবে বলে আশা করছেন স্থানীয়রা।
এস এম সোহাগ ফরাজী।।