দেশে প্রায় ৮২ লাখ মাদকাসক্ত; বিশেষ ট্রাইব্যুনাল, আধুনিক নিরাময় কেন্দ্র ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ
ঢাকা, ২৫ জুন ২০২৬:
মাদকের ভয়াবহ ছোবল থেকে দেশকে রক্ষা করতে সরকার বিদ্যমান আইনি কাঠামো আরও শক্তিশালী ও যুগোপযোগী করার উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন’ সংশোধন ও আধুনিকায়নের কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই এটি জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হবে।
বৃহস্পতিবার সকালে বাংলাদেশ সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে ‘২৬ জুন মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচার বিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস’ উপলক্ষে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) আয়োজিত প্রেস ব্রিফিং এবং লাইসেন্সপ্রাপ্ত বেসরকারি মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রসমূহের অনুকূলে সরকারি অনুদানের চেক বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অপরাধীরা বর্তমানে প্রযুক্তির সহায়তায় অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও অর্থ পাচারের মাধ্যমে মাদক ব্যবসা পরিচালনা করছে। ফলে দুর্বল আইনি কাঠামো দিয়ে এ ধরনের অপরাধ দমন সম্ভব নয়। অপরাধীদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে এবং সমাজকে মাদকমুক্ত করতে একটি শক্তিশালী ও কার্যকর আইনি ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের বিদ্যমান সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের সশস্ত্র মাদক চোরাকারবারিদের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত সরঞ্জাম ছাড়াই অভিযান পরিচালনা করতে হয়। এ পরিস্থিতি পরিবর্তনে অধিদপ্তরে অত্যাধুনিক অস্ত্র, প্রয়োজনীয় পরিবহন সুবিধা ও ডগ স্কোয়াড যুক্ত করা হচ্ছে। পাশাপাশি আসামিদের থানায় সোপর্দের পূর্ববর্তী সময়ের জন্য আধুনিক হাজতখানা নির্মাণের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রী জানান, মামলা জট কমিয়ে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে মাদক সংক্রান্ত অপরাধের জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল ও এখতিয়ারসম্পন্ন আদালত গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া অনলাইন জুয়া দমনে আধুনিক আইন প্রণয়ন করা হয়েছে এবং পর্যায়ক্রমে সাইবার অপরাধ দমন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আধুনিকায়ন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে আরও আইনি সংস্কার আনা হবে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এক জাতীয় গবেষণার তথ্য তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দেশে বর্তমানে প্রায় ৮২ লাখ মানুষ মাদকাসক্ত, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ। নতুন নতুন সিনথেটিক ও সেমি-সিনথেটিক মাদকের বিস্তার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ঢাকার তেজগাঁওসহ তিনটি বিভাগীয় শহরের নিরাময় কেন্দ্রের শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়েছে। এছাড়া কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রকে ২৫০ শয্যায় উন্নীত করার কাজ চলমান রয়েছে।
তিনি আরও জানান, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, রংপুর, সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগীয় শহরে ১ হাজার ৪১৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০০ শয্যা বিশিষ্ট অত্যাধুনিক মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র নির্মাণের প্রকল্প শুরু হয়েছে। এসব কেন্দ্রে চিকিৎসার পাশাপাশি দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তরুণদের সমাজের মূলধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা থাকবে।
সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করতে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশব্যাপী লাইসেন্সপ্রাপ্ত ৪০৩টি কেন্দ্রের মধ্যে নির্বাচিত ৭৩টি বেসরকারি মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রকে মোট ১ কোটি ১০ লাখ টাকা অনুদান দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বেসরকারি কেন্দ্রগুলোকে বাণিজ্যিক মনোভাব পরিহার করে সরকারি বিধিমালা ও জাতীয় গাইডলাইন অনুসরণ করে মানবিক ও মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।