লালমনিরহাটে বিচারক সংকট ও আদালত ভবনের অভাবে বাড়ছে মামলার জট: ৯ বিচারকের ৬ পদই শূন্য, চরম ভোগান্তিতে বিচারপ্রার্থীরা
লালমনিরহাট জেলা প্রতিনিধি (মিলন কুমার):
আদালত ভবনের তীব্র অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং দীর্ঘদিনের বিচারক সংকটে লালমনিরহাটে বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি এখন চরমে পৌঁছেছে। চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের সিংহভাগ বিচারিক পদ শূন্য থাকায় মামলার নিয়মিত শুনানি ও নিষ্পত্তিতে মারাত্মক স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। ফলে প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে ন্যায়বিচারের আশায় এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে কেবল পরবর্তী ধার্য তারিখ নিয়েই বাড়ি ফিরতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। এতে একদিকে সময় ও বাড়তি অর্থের অপচয় হচ্ছে, অন্যদিকে দীর্ঘায়িত হচ্ছে বিচার পাওয়ার অপেক্ষা।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত লালমনিরহাট জেলায় দেওয়ানি ও ফৌজদারি মিলিয়ে মোট বিচারাধীন মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩১ হাজার ৬৪৯টি। এর মধ্যে কেবল চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতেই বিচারাধীন রয়েছে ১১ হাজার ৫৪৭টি মামলা। এসব মামলা নিষ্পত্তির জন্য ৯টি আদালত নির্ধারিত থাকলেও ৯ জন বিচারকের বিপরীতে বর্তমানে ৬টি বিচারিক পদই দীর্ঘদিন ধরে শূন্য পড়ে রয়েছে। ফলে মাত্র ৩ জন বিচারক দিয়ে বিশাল এই বিচারিক চাপ সামাল দিতে গিয়ে মামলার জট প্রতিনিয়ত আরও বাড়ছে।
নেই স্বতন্ত্র সিজেএম ভবন, গাদাগাদি করে কার্যক্রম:
২০০৭ সালে নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথক করা হলেও লালমনিরহাটে দীর্ঘ প্রায় দুই দশকেও চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের জন্য কোনো পৃথক বা স্বতন্ত্র আধুনিক ভবন নির্মিত হয়নি। বর্তমানে জেলা জজ আদালতের পুরোনো ও অপরিসর কক্ষে কোনোমতে কার্যক্রম চালাতে গিয়ে বিচারক ও আইনজীবীদের চরম হিমশিম খেতে হচ্ছে।
আদালতের প্রকাশিত বিচারক তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে—অতিরিক্ত চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের ১টি, সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের ২টি এবং জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের ৩টি পদই বর্তমানে সম্পূর্ণ শূন্য।
দূর-দূরান্ত থেকে এসে শুধুই ‘তারিখ’ নিয়ে ফেরা:
বিচারক সংকটের কারণে আদালতে এসে বারবার ফিরে যেতে বাধ্য হওয়া সাধারণ মানুষের দীর্ঘশ্বাস এখন আদালত চত্বরের প্রাত্যহিক চিত্র।
কালীগঞ্জ উপজেলার চন্দ্রপুর ইউনিয়ন থেকে আসা নুর হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, একটি জমিসংক্রান্ত মামলার শুনানির জন্য তাঁকে বারবার দূর থেকে অর্থ খরচ করে আসতে হয়। কিন্তু এজলাসে বিচারক না থাকায় কোনো শুনানি ছাড়াই নতুন তারিখ নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। এভাবে মাসের পর মাস যাতায়াত করতে গিয়ে তিনি আর্থিকভাবে নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন।
একই অভিজ্ঞতার কথা জানান ভারত সীমান্তবর্তী পাটগ্রাম উপজেলার বুড়িমারী ইউনিয়নের বাসিন্দা আদম আলী। তিনি বলেন, “বুড়িমারী থেকে লালমনিরহাট জেলা সদরের দূরত্ব প্রায় ৯৫ কিলোমিটার। সকালের মধ্যে আদালতে পৌঁছাতে হলে আমাকে ভোরবেলায় ট্রেনে উঠতে হয়। কিন্তু এখানে এসে যখন শুনি বিচারক নেই, তখন চরম হতাশা নিয়ে আবার বাড়ি ফিরতে হয়। এভাবে বিচার পেতেই যদি বছর পার হয়ে যায়, তবে সাধারণ মানুষ কোথায় যাবে?”
আইনজীবী ও নাগরিক সমাজের উদ্বেগ:
লালমনিরহাট জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য অ্যাডভোকেট হাফিজুর রহমান বলেন, “বিচার বিভাগ পৃথক হলেও স্বতন্ত্র ভবন না থাকায় বিচারক ও আইনজীবীদের কাজের উপযুক্ত পরিবেশ নেই। একটি এজলাসে একাধিক মামলার আসামিদের ঠাসাঠাসি করে দাঁড় করিয়ে শুনানি করতে হয়। এমনকি এজলাসে জায়গা না পেয়ে অনেক আসামিকে বাইরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে হাজিরা দিতে হয়।”
তিনি আরও জানান, দূর থেকে আসা নারী বিচারপ্রার্থীদের জন্য আদালতে কোনো নিরাপদ বসার জায়গা, পর্যাপ্ত শৌচাগার, নামাজের স্থান কিংবা দুগ্ধপোষ্য শিশুদের দুধ পান করানোর ন্যূনতম কোনো ব্যবস্থা নেই।
আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রফিকুল ইসলাম ও আইনজীবী সৈকত আহমেদ যৌথভাবে জানান, দ্রুত সিজেএম আদালতের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ বহুতল ভবন নির্মাণ এবং শূন্য থাকা ৬টি বিচারিক পদে দ্রুত দক্ষ বিচারক পদায়ন না করলে এই জট ভবিষ্যতে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) লালমনিরহাট জেলা শাখার সভাপতি আমিরুল হায়াত মুকুল বলেন, “মামলা ও জনসংখ্যার অনুপাতে বিচার বিভাগীয় অবকাঠামো উন্নয়ন এখন সময়ের দাবি। দ্রুত শূন্য পদগুলো পূরণ করে বিচারপ্রার্থীদের ন্যায়বিচার পাওয়ার সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করতে আইন মন্ত্রণালয়ের অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।”
দৈনিক জীবনযাত্রা,