মানিক পশারীর দাফনে বাধা দেওয়া হয়নি বলে মাসুদ সাঈদীর দাবি: মাঠের ভিডিও ও অনলাইনে জামায়াত-শিবিরের সক্রিয়তা প্রকাশ
বিশেষ প্রতিবেদক:
একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আমৃত্যু কারাদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াত নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য প্রয়াত দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে মামলার বাদী মানিক পশারীর মৃত্যুর পর পিরোজপুরে তাঁর দাফন ও গার্ড অব অনার নিয়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
সাঈদী-পুত্র ও পিরোজপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মাসুদ সাঈদী দাবি করেছেন—মানিক পশারীর দাফনে জামায়াতের পক্ষ থেকে কোনো বাধা দেওয়া হয়নি, আপত্তি ছিল কেবল ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাকে’ রাষ্ট্রীয় গার্ড অব অনার প্রদান নিয়ে। তবে স্বাধীন অনুসন্ধানী মাধ্যম ‘দ্য ডিসেন্ট’-এর ফ্যাক্টচেক ও ভিডিও বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মাসুদ সাঈদীর এ দাবি মাঠের প্রকৃত বাস্তবতার সঙ্গে মেলেনি। মানিক পশারীকে পিরোজপুরের মাটিতে দাফন করতে না দেওয়ার জন্য স্থানীয় জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীরা সরাসরি মাঠে মিছিল, মাইকিং এবং অনলাইনে জোরালো প্রচারণা চালিয়েছেন।
মাসুদ সাঈদীর ফেসবুক স্ট্যাটাস ও ট্রাইব্যুনালের জবানবন্দি দাবি:
গত শনিবার (২৪ অক্টোবর ২০২৬) সকালে মানিক পশারীর মৃত্যুর পর মাসুদ সাঈদী নিজের ফেসবুক পোস্টে দীর্ঘ বক্তব্য দেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, “লাশ দাফনে বা জানাজায় কোনো বাধা ছিল না, জনগণের আপত্তি ছিল ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাকে ‘গার্ড অব অনার’ প্রদানে—যা রাষ্ট্রীয় মর্যাদার অবমাননা।”
ওই পোস্টে মানিক পশারীর গেজেটভুক্ত হওয়া নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের একটি কথিত জবানবন্দি উদ্ধৃত করে মাসুদ সাঈদী দাবি করেন, মানিক পশারী ট্রাইব্যুনালে স্বীকার করেছিলেন তিনি সরাসরি মুক্তিযুদ্ধ করেননি, মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করেছিলেন এবং তৎকালীন আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য এ কে এম এ আউয়াল তাঁকে মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় অন্তর্ভুক্তির জন্য ডিও লেটার দিয়েছিলেন। মাসুদ সাঈদী অভিযোগ করেন, মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার পুরস্কার হিসেবেই তাঁকে মুক্তিযোদ্ধা বানানোর অপচেষ্টা করা হয়েছিল। তবে মাসুদ সাঈদীর উল্লেখিত এই বক্তব্যটি আলাদাভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
মাঠের বাস্তবতা ও ভিডিও যাচাই: প্রকাশ্যে দাফন ঠেকানোর ডাক:
মাসুদ সাঈদী দাফনে কোনো বাধা ছিল না দাবি করলেও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক প্রত্যক্ষ ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে ভিন্ন চিত্র পেয়েছে অনুসন্ধানকারী দল। ভিডিওগুলোতে দেখা যায়, পিরোজপুরের মাটিতে মানিক পশারীর লাশ দাফন করতে না দেওয়ার প্রকাশ্য দাবিতে স্থানীয় জামায়াত ও শিবিরের দায়িত্বশীল নেতারা মিছিল ও মাইকিং করেছেন।
আব্দুর রাজ্জাকের অবস্থান: পিরোজপুর জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি আব্দুর রাজ্জাকের দেওয়া একটি বক্তব্যের ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি মানিক পশারীকে ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা’ দাবি করে বক্তব্য দিচ্ছেন।
মিছিলের নেতৃত্বে শিবিরের সাবেক ও জামায়াত নেতা: আব্দুর রাজ্জাকের বক্তব্যের সময় ঠিক পেছনে দাঁড়ানো টুপি-পাঞ্জাবি পরিহিত ব্যক্তিকে পরবর্তীতে মানিক পশারীর লাশ পিরোজপুরে দাফন না করার দাবিতে বের হওয়া বিক্ষোভ মিছিলের সামনের সারিতে দেখা যায়। তাঁর পরিচয় শনাক্ত হয়েছে—তিনি পিরোজপুর সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজ শিবিরের সাবেক সেক্রেটারি মো. মুইন উদ্দিন। এছাড়া ওই মিছিলটির নেতৃত্বে ছিলেন জিয়ানগর সদর ইউনিয়ন জামায়াতের যুব বিভাগের সভাপতি আহাদুল ইসলাম নাঈম।
মাসুদ সাঈদীর স্লোগান খচিত গেঞ্জি পরিহিতের মাইকিং: আব্দুর রাজ্জাকের পেছনে থাকা অপর এক মধ্যবয়স্ক ব্যক্তিকে মাইক হাতে প্রকাশ্য রাস্তায় ঘোষণা দিতে দেখা যায়—‘সাঈদীর মামলার বাদী কুলাঙ্গার মানিকের পিরোজপুরের মাটিতে আমরা দাফন করতে দিব না।’ সে সময় তাঁর পরনে ছিল ‘জননেতা মাসুদ সাঈদীর সালাম নিন, ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ গড়তে সুযোগ দিন’ লেখা সংবলিত একটি কালো গেঞ্জি। তাঁর সঙ্গে থাকা অন্যান্য ব্যক্তিদেরও দাফনবিরোধী স্লোগানে গলা মেলাতে দেখা যায়।
অনলাইনে জামায়াত-শিবির আইডির তীব্র প্রচারণা:
মাঠের মিছিল-মাইকিংয়ের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও মানিক পশারীর দাফন পিরোজপুর ও আশপাশের এলাকায় ঠেকাতে সক্রিয় প্রচারণা চালান স্থানীয় জামায়াত-শিবির সংশ্লিষ্টরা।
পিরোজপুর সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজ ছাত্রশিবিরের সভাপতি রেদওয়ান নিজের ফেসবুক আইডিতে একটি বিক্ষোভের ভিডিও শেয়ার করে লেখেন, পিরোজপুর সদর ও জিয়ানগরে লাশ দাফনে ব্যর্থ হওয়ার পর নাজিরপুরের কোথাও দাফনের চেষ্টা হলে সেখানেও ‘সাঈদী প্রেমিকরা’ যেন রাত জেগে পাহারা দেন। অপর এক পোস্টে তিনি মানিক পশারীর কোনো স্থান পিরোজপুরের মাটিতে হবে না বলে মন্তব্য করেন। এছাড়া ‘Md Aslam Sheikh’ ও ‘Aminul Bin Aziz’ সহ একাধিক স্থানীয় আইডি থেকে সাঈদীর স্মৃতিবিজড়িত মাটিতে মানিক পশারীর দাফন প্রতিহত করার প্রকাশ্যে ডাক দেওয়া হয়।
জামায়াত জেলা নেতৃত্বের আত্মপক্ষ সমর্থন:
এ বিষয়ে পিরোজপুর জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি জহিরুল হক জানান, “জামায়াতের দলীয় ফোরাম থেকে কোনো বাধা দেওয়ার আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত বা নির্দেশনা ছিল না। প্রয়াত আল্লামা সাঈদীর প্রতি গভীর আবেগ ও ভালোবাসা থেকে সাধারণ সাঈদীপ্রেমী জনতা এমন ক্ষোভ প্রকাশ করে থাকতে পারেন। সেই জমায়েতে জামায়াতের কোনো ব্যক্তি উপস্থিত থাকলেও তা দলীয় কোনো অবস্থান নয়।”
উল্লেখ্য, দিনভর তীব্র উত্তেজনা, মাইকিং এবং বাড়িতে খোঁড়া প্রথম কবরটি ভরাট করে ফেলার পর প্রশাসনের উদ্যোগে সমঝোতা হয়। পরবর্তীতে মধ্যরাত আড়াইটার দিকে পুলিশ লাইনসে ফ্রিজিং গাড়িতে রাখা মানিক পশারীর মরদেহ কড়া পুলিশি পাহারায় শংকরপাশা ইউনিয়নের চিতলিয়া গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে গার্ড অব অনার প্রদান শেষে পুলিশি পাহারায় পারিবারিক কবরস্থানে তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়।
সূত্র Dissent