দ্বিতীয় দিনে গড়াল সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের আন্দোলন: ভবনে তালা, দুদিন ধরে অবরুদ্ধ অধ্যক্ষসহ ১৪ শিক্ষক
সিলেট প্রতিনিধি, শাহ তোফাজ্জুল হোসেন ভান্ডারী:
কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনতা থেকে মুক্তির এক দফা দাবিতে সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ও প্রশাসনিক ভবন অবরোধ কর্মসূচি টানা দ্বিতীয় দিনের মতো অব্যাহত রয়েছে। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা প্রশাসনিক ভবনের প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে ভেতরে দায়িত্বপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ, ১৪ জন শিক্ষক এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের টানা দুদিন ধরে অবরুদ্ধ করে রেখেছেন।
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬) দুপুরে সরেজমিনে ক্যাম্পাস প্রাঙ্গণে গিয়ে দেখা যায়, শত শত শিক্ষার্থী প্রশাসনিক ভবনের প্রবেশপথে অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন স্লোগান দিচ্ছেন। প্রধান ফটক ভেতর-বাইর থেকে তালাবদ্ধ থাকায় দায়িত্বপ্রাপ্ত অধ্যক্ষসহ ১৪ জন শিক্ষক এবং অন্তত ৬ থেকে ৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী ভবনের ভেতরে আটকে রয়েছেন।
এর আগে গত রবিবার বেলা ১১টার দিকে প্রশাসনিক ভবনের প্রধান গেটে তালা ঝুলিয়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য এই অবরোধ কর্মসূচি শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। ফলে রবিবার দুপুর থেকেই ভবনের ভেতরে পানাহার ও অন্যান্য দৈনন্দিন সুযোগ-সুবিধা ছাড়া অবরুদ্ধ অবস্থায় চরম দুর্ভোগের মধ্যে দিন পার করছেন শিক্ষকেরা।
এদিকে অচলাবস্থা নিরসনে সোমবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে শিক্ষার্থীদের একটি প্রতিনিধি দল জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গিয়ে সিলেটের জেলা প্রশাসক আবদুল্লাহ আল মামুনের সঙ্গে জরুরি বৈঠকে বসে। ওই বৈঠকে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের (সিসিক) প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীও অংশ নিয়ে সংকট সমাধানের পথ খুঁজতে আলোচনা করেন।
২০০৭ সালে প্রতিষ্ঠিত স্নাতক পর্যায়ের এই বিশেষায়িত প্রকৌশল প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল (EEE), পুরকৌশল (CE) এবং কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল (CSE) বিভাগের পাঁচটি ব্যাচে প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন।
বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করে বলেন, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে থাকার কারণে সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রির স্বকীয়তা, গুণগত ও পেশাগত মান মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে স্বায়ত্তশাসন অথবা সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামোর অন্তর্ভুক্তির দাবি জানিয়ে এলেও কোনো কার্যকর সমাধান মেলেনি।
তাদের সাফ বক্তব্য—অবিলম্বে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনতা বাতিল করে প্রতিষ্ঠানটিকে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) সরাসরি পূর্ণাঙ্গ অনুষদ বা বিশেষ মর্যাদায় অধিভুক্ত করতে হবে। এই দাবি প্রজ্ঞাপন আকারে জারি না হওয়া পর্যন্ত কলেজের সব ধরনের ক্লাস, সেমিস্টার পরীক্ষা, ল্যাব কার্যক্রমসহ সব ধরনের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য পুরোপুরি ‘শাটডাউন’ থাকবে।
পরিস্থিতির মধ্যে গত রবিবার বিকেলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের উপসচিব সাজ্জাদ হোসেন স্বাক্ষরিত এক জরুরি প্রজ্ঞাপনে কলেজের অধ্যক্ষের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা সহযোগী অধ্যাপক মো. আসাদুজ্জামানকে ফরিদপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে বদলি করা হয়। একই আদেশে ময়মনসিংহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের সহযোগী অধ্যাপক মো. সাহিদ ইকবালকে সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পদায়ন করে সোমবারের মধ্যে কর্মস্থলে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়।
তবে এই প্রশাসনিক বদলিকে শিক্ষার্থীদের মূল দাবি ধামাচাপা দেওয়ার কৌশল হিসেবে আখ্যা দিয়ে তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন আন্দোলনকারীরা। আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী এক শিক্ষার্থী সাফ জানিয়ে দেন, “দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত বদলি হওয়া অধ্যক্ষকে আমরা ক্যাম্পাস ছাড়তে দেব না এবং নতুন কোনো অধ্যক্ষকেও ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। সমাধান ছাড়া পুরো ক্যাম্পাস অচল থাকবে।”
প্রশাসনিক ভবনের ভেতরে আটকে পড়া কলেজের সহকারী অধ্যাপক মো. খলিলুর রহমান অসহায়ত্ব প্রকাশ করে বলেন, “শিক্ষার্থীরা যেসব দাবি তুলছে, তা নীতিগত সিদ্ধান্তের বিষয় এবং তা কেবল মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পর্যায় ছাড়া কলেজের শিক্ষকদের পক্ষে সমাধান করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কিন্তু বিষয়টি অনুধাবন না করে তারা শিক্ষকদের এভাবে অবরুদ্ধ করে রেখেছে। আমরা প্রায় ৪৮ ঘণ্টা ধরে ভবনের ভেতরে আটকা আছি, যা অত্যন্ত কষ্টদায়ক।”
এস এম সোহাগ ফরাজী