পটুয়াখালীতে অটোরিকশাচালক জাকারিয়া হত্যার মূল রহস্য উদঘাটন: পরিকল্পনাকারী সাইফুলসহ গ্রেপ্তার ৩, আদালতে স্বীকারোক্তি
পটুয়াখালী প্রতিনিধি:
পটুয়াখালী সদর উপজেলার চর জৈনকাঠী এলাকায় ক্লুলেস অটোরিকশাচালক মো. জাকারিয়া শরীফ (২৮) হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ। একই সঙ্গে তথ্যপ্রযুক্তি ও ধারাবাহিক অভিযানের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী মো. সাইফুল ইসলামসহ সরাসরি জড়িত দুই ঘাতক এবং চোরাই ব্যাটারি ক্রেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন—হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী পটুয়াখালী সদর এলাকার মো. সাইফুল ইসলাম (২৯), তার সহযোগী মো. মামুন হাওলাদার (২৯) এবং চোরাই ব্যাটারির ক্রেতা মহিপুর থানার মো. শুক্কুর আকন (৪৫)।
পুলিশ জানায়, এ ঘটনায় নিহত জাকারিয়ার পিতা মো. রুহুল আমিন শরীফ বাদী হয়ে পটুয়াখালী সদর থানায় একটি হত্যা মামলা (মামলা নং-২৯, তারিখ: ১০-০৯-২০২৬ খ্রিঃ) দায়ের করেন। এরপর জেলা পুলিশের একাধিক দল, জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি), নৌ পুলিশ, সিআইডি ও পিবিআই সমন্বিতভাবে তদন্তে নামে। ঘটনার তদন্তে শহরের প্রবেশমুখ ও আশপাশের শতাধিক সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ এবং স্থানীয় গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে আসামিদের শনাক্ত করা হয়।
পরবর্তীতে দেশের বিভিন্ন জেলায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে মূল পরিকল্পনাকারী সাইফুল ইসলামকে গাজীপুর থেকে, সহযোগী মামুন হাওলাদারকে পটুয়াখালী সদর এলাকা থেকে এবং চোরাই মালামাল ক্রয়কারী শুক্কুর আকনকে মহিপুর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযানে উদ্ধার করা হয়েছে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি সিএনজি অটোরিকশা, ভিকটিমের ব্যাটারিচালিত রিকশা এবং চুরি যাওয়া ৩টি ব্যাটারি।
নেপথ্যের কারণ ও লোমহর্ষক ঘটনাপ্রবাহ:
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদ ও বিজ্ঞ আদালতে দেওয়া আসামিদের ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি সূত্রে জানা যায়, নিহত জাকারিয়া ও ঘাতক সাইফুল ইসলাম উভয়েই মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত ছিলেন। ঘটনার কিছুদিন পূর্বে জাকারিয়া সাইফুলকে ৩ লাখ ৭০ হাজার টাকার বিনিময়ে ইয়াবার চালান দেওয়ার চুক্তি করেন। কিন্তু দীর্ঘদিনেও তিনি মাদক বা টাকা ফেরত না দেওয়ায় তাঁদের মধ্যে তীব্র বিরোধ সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে সাইফুল তার অপর সহযোগী অটোচালক মামুনকে সঙ্গে নিয়ে জাকারিয়াকে হত্যার চূড়ান্ত পরিকল্পনা করে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, গত ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সন্ধ্যায় সাইফুল ফোন করে জাকারিয়াকে পটুয়াখালী চৌরাস্তায় ডেকে নেয়। সেখানে জাকারিয়াকে বলা হয় যে জৈনকাঠী খেয়াঘাটে মাদকের নতুন চালান এসেছে। জাকারিয়া ও মামুন তাঁদের অটোরিকশা চৌরাস্তায় রেখে সাইফুলের বাবার ভাড়ায় চালিত সিএনজিতে উঠে জৈনকাঠী খেয়াঘাটে যান। যাওয়ার পথে সাইফুল সিএনজি মেরামতের একটি ক্যাবল তার পকেটে লুকিয়ে রাখেন।
খেয়াঘাটে পৌঁছে তারা তিনজন একত্রে মাদক সেবন করেন। মাদক সেবনের একপর্যায়ে পূর্বপরিকল্পিতভাবে মাদক ও টাকার বিষয় নিয়ে বাকবিতণ্ডা শুরু হলে সাইফুল পকেট থেকে ক্যাবল বের করে পেছন থেকে জাকারিয়ার গলায় ফাঁস দেন এবং মামুন তার পা চেপে ধরে শ্বাসরোধ করে মৃত্যু নিশ্চিত করেন। এরপর মরদেহটি পাশে থাকা লোহালিয়া নদীতে ফেলে দেওয়া হয়।
হত্যার পর ঘাতকরা পুনরায় চৌরাস্তায় ফিরে এসে জাকারিয়ার অটোরিকশাটি বিসিক শিল্প এলাকার নির্জন নদীর পাড়ে নিয়ে যায়। সেখানে অটোরিকশাটির তিনটি ব্যাটারি খুলে সাইফুলের সিএনজিতে তোলা হয়। চতুর্থ ব্যাটারি খোলার সময় একটি মোটরসাইকেলের আগমন দেখে তারা পুরো অটোরিকশাটি নদীতে ঠেলে ফেলে দিয়ে ব্যাটারিগুলো নিয়ে মহিপুরে চলে যায়। পরবর্তীতে মহিপুরের শুক্কুর আকনের কাছে মাত্র ২০ হাজার টাকায় ব্যাটারিগুলো বিক্রি করে সেই টাকা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয়।
ঘটনার পরদিন (৮ সেপ্টেম্বর) সকালে লোহালিয়া নদীতে লাশ ভাসতে দেখে স্থানীয়রা ৯৯৯-এ ফোন করলে পুলিশ নদী থেকে অজ্ঞাত হিসেবে লাশ উদ্ধার করে, যা পরবর্তীতে স্বজনরা শনাক্ত করেন।
পটুয়াখালী জেলা পুলিশ নিশ্চিত করেছে যে, গ্রেপ্তারকৃত তিন আসামিকে বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করা হলে তারা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করে। হত্যাকাণ্ডে আর কোনো সহযোগী বা অর্থের যোগানদাতা রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে মামলাটির অধিকতর তদন্ত অব্যাহত রাখা হয়েছে।
এস এম সোহাগ ফরাজী