পাওনাদারদের ফাঁসাতে সাজানো অপহরণের নাটক: সাড়ে ৪ বছর মাজার ও বেদে পল্লীতে আত্মগোপনের পর ডিবি পুলিশের জালে হোটেল মালিক
ক্রাইম ডেস্ক / পটুয়াখালী: পাওনাদারদের দেনা পরিশোধ না করে উল্টো তাঁদের মিথ্যা অপহরণ মামলায় ফাঁসাতে দীর্ঘ সাড়ে চার বছর আত্মগোপনে থাকা পটুয়াখালীর আলোচিত এক হোটেল মালিককে জীবিত উদ্ধার করেছে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬) দিবাগত রাত আনুমানিক ১টার দিকে মাদারীপুর জেলার কালকিনি থানা এলাকার একটি বেদে পল্লীতে বিশেষ অভিযান চালিয়ে তাঁকে উদ্ধার করা হয়।
উদ্ধার হওয়া ব্যক্তির নাম আ. মান্নান প্যাদা (৭০)। তিনি পটুয়াখালী সদর থানার ইটবাড়িয়া ইউনিয়নের বল্লভ গ্রামের বাসিন্দা।
যেভাবে অপহরণ নাটকের সূত্রপাত
পুলিশ ও মামলা সূত্রে জানা যায়, ২০২০ সালে বরগুনা জেলার তালতলী থানাধীন জয়ালভাঙ্গা এলাকায় তালতলী তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সামনে ‘পটুয়াখালী হোটেল’ নামে একটি ভাতের হোটেলের ব্যবসা পরিচালনা করতেন আ. মান্নান প্যাদা। তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণকাজে নিয়োজিত দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিপুলসংখ্যক শ্রমিক তাঁর হোটেলে নিয়মিত খাবার খেতেন। অন্যদিকে মান্নান প্যাদাও স্থানীয় মুদি, মাছ ও মুরগি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বাকিতে কাঁচামাল ক্রয় করে ব্যবসা চালাতেন।
একপর্যায়ে কোম্পানি দুটির কাছে তাঁর প্রায় ১২ লাখ টাকা পাওনা জমে। এর মধ্যে একটি কোম্পানি তাঁকে ৪ লাখ টাকা পরিশোধ করলে তিনি স্থানীয় ব্যবসায়ীদের পাওনার আংশিক পরিশোধ করেন। তবে বাকি পাওনা নিয়ে ব্যবসায়ীদের সাথে তাঁর কথাকাটাকাটি হয়।
পরবর্তীতে হোটেল ম্যানেজার মো. নুর আলম সিকদারের প্ররোচনা ও কুপরামর্শে পাওনাদারদের শায়েস্তা করতে এবং দেনা থেকে বাঁচতে নিখোঁজ ও সাজানো অপহরণের পরিকল্পনা করেন মান্নান প্যাদা। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২২ সালে প্রথমে পটুয়াখালী সদর থানায় একটি নিখোঁজ জিডি এবং পরবর্তীতে ২০২২ সালের ১৪ আগস্ট তাঁর ছেলে মো. জসিম প্যাদা বাদী হয়ে নির্দোষ পাওনাদারদের বিরুদ্ধে বিজ্ঞ আদালতে পেনাল কোডের ৩৬৪/৩৬৫/১০৯ ধারায় মিথ্যা অপহরণের সিআর মামলা দায়ের করেন।
ছদ্মবেশে মাজার থেকে মাজারে সাড়ে চার বছর
পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে এবং মামলাকে সত্য প্রমাণ করতে ম্যানেজার নুর আলমের সাথে যোগাযোগ রেখে মান্নান প্যাদা দীর্ঘ সাড়ে চার বছর রূপ পাল্টে আত্মগোপনে থাকেন।
তদন্তে জানা যায়, প্রথমে তালতলী থেকে ঢাকা হয়ে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ায় কেবলা বাবার মাজারে আশ্রয় নেন। এরপর পর্যায়ক্রমে কুমিল্লার বেলতলী সোলেমান ল্যাংটার মাজার এবং চট্টগ্রামের মাইজভাণ্ডার দরবারে ছদ্মবেশে দিন কাটান। পরে ঢাকায় ফিরে মিরপুর ১২ নম্বরের উজারাঘাটে একটি আবাসিক বাড়িতে কিছুদিন নিরাপত্তারক্ষীর চাকরি করেন।
এরপর চাকরি ছেড়ে আবার ছদ্মবেশ ধারণ করে যশোর বড়বাজারের গাজী কালুর মাজার, বাগেরহাটের হযরত খানজাহান আলী (রহ.)-এর মাজার এবং বাকেরগঞ্জের বারো আউলিয়ার মাজারে আত্মগোপন করেন। সর্বশেষ বাগেরহাটে পরিচয় হওয়া এক ‘ধর্মের মেয়ে’র বরিশালের বাসায় আশ্রয় নিয়ে সেখান থেকে মাদারীপুরের কালকিনিতে তাঁর ভগ্নিপতির এলাকার এক বেদে পল্লীতে বসবাস শুরু করেন।
ডিবি পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান ও ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি
অপহরণ মামলা হওয়ার পর থেকে ছদ্মবেশী মান্নান প্যাদার অবস্থান শনাক্ত করা অত্যন্ত দুরূহ হয়ে পড়েছিল। পটুয়াখালী জেলা পুলিশ ও জেলা গোয়েন্দা শাখার একাধিক চৌকস দল দীর্ঘ অনুসন্ধান ও আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি সহায়তায় অবশেষে মাদারীপুরের কালকিনিতে তাঁর অবস্থান শনাক্ত করে। ১৬ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতে ডিবির একটি বিশেষ টিম অভিযান চালিয়ে বেদে পল্লী থেকে তাঁকে জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হয়।
আটকের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মান্নান প্যাদা স্বীকার করেন, দেনার দায় এড়াতে এবং পাওনাদারদের চরম হয়রানি ও অর্থনৈতিকভাবে ধ্বংস করতেই তিনি ম্যানেজারের সহায়তায় এই নিখোঁজ ও অপহরণের নাটক সাজিয়েছিলেন।
উদ্ধারের পর বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করা হলে তিনি ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেছেন।
পটুয়াখালী জেলা পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় নিরীহ মানুষদের মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর সাথে যুক্ত হোটেল ম্যানেজার নুর আলমসহ মূল ইন্ধনদাতা ও সহায়তাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে।
এস এম সোহাগ ফরাজী