ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি, ‘নির্ভীক জুলাই’ ও শিক্ষক মূল্যায়ন ওয়েবসাইট: কঠোর ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি ঢাবি প্রশাসনের, ‘দ্বৈত প্রশাসন’ চালুর অভিযোগ
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক / ঢাকা: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি স্থাপন, অনুমতিহীন স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ এবং নিজস্ব উদ্যোগে শিক্ষক মূল্যায়নের ওয়েবসাইট চালু করার ঘটনায় তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের হুঁশিয়ারি দিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) কর্তৃপক্ষ। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত কাঠামোর বাইরে গিয়ে ডাকসুর এ ধরনের পদক্ষেপকে ‘সমান্তরাল বা দ্বৈত প্রশাসন প্রতিষ্ঠার অপচেষ্টা’ হিসেবে অভিহিত করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬) বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তরের উপ-পরিচালক ফররুখ মাহমুদের পাঠানো এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে প্রশাসনের এই সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন অবস্থান তুলে ধরা হয়।
জিন্নাহর ছবি নিয়ে তীব্র বিতর্ক ও প্রতিবাদ
সংস্কার শেষে গত রবিবার ডাকসু সংগ্রহশালা উদ্বোধনের পর দেখা যায়, সেখানে স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একক বা গৌরবোজ্জ্বল ছবি ঠাঁই না পেলেও স্থান পেয়েছে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর তিনটি ছবি। এর মধ্যে ১৯৪৮ সালে রেসকোর্স ময়দানে ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’ ঘোষণার ছবিও রয়েছে।
এ নিয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানায় সরকার সমর্থক ছাত্র সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। এক বিবৃতিতে ছাত্রদল অভিযোগ করে, “মধুর ক্যান্টিনের নাম পরিবর্তনের অপচেষ্টা থেকে শুরু করে জিন্নাহর বিতর্কিত ছবি টানানো—এসব কর্মকাণ্ড প্রমাণ করে বর্তমান ডাকসু নেতৃত্ব ১৯৭১ সালের পরাজিত শক্তির প্রতি অনুরাগ ও ‘পাকিস্তান প্রেম’ জাহির করছে।”
এরপর সোমবার দুপুরে সংগ্রহশালায় ঢুকে জিন্নাহর ছবি তিনটি ছিঁড়ে প্রতিবাদ জানান সাধারণ শিক্ষার্থী আবু তৈয়ব হাবিলদার। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ভাষা আন্দোলনের নায়কদের অবমূল্যায়ন করে উর্দুর প্রবক্তার ছবি কোনোভাবেই ঢাবিতে রাখা যায় না।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কড়া বিবৃতি ও তিন বিষয়ে আপত্তি
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাদের বিজ্ঞপ্তিতে তিনটি সুনির্দিষ্ট বিষয়ে ডাকসুর বিরুদ্ধে আইন ও এখতিয়ার লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলে:
১. ইতিহাসবিরোধী ছবি প্রদর্শন: প্রশাসন স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, “ভাষা আন্দোলন ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এমন ব্যক্তিদের ছবি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রহশালায় প্রদর্শন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।” জিন্নাহ ও তৎকালীন ছাত্রসংঘের নেতা আব্দুল মালেকের ছবি প্রদর্শনের বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
২. অনুমতি ছাড়া ‘নির্ভীক জুলাই’ স্মৃতিস্তম্ভ: ঢাবি প্রশাসন জানায়, গত ৫ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, প্রশাসন ও শহীদ পরিবার যৌথভাবে কেন্দ্রীয় মলচত্বরে জুলাই স্মৃতিস্তম্ভের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছে। কিন্তু গত ২ সেপ্টেম্বর ডাকসু সিন্ডিকেট বা উপাচার্যের কোনো লিখিত অনুমোদন না নিয়েই লাইব্রেরির সামনে ‘নির্ভীক জুলাই’ নামে একটি স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করেছে, যা আইন অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পত্তি নিয়ন্ত্রণ নীতিমালার সম্পূর্ণ পরিপন্থী ও এখতিয়ারবহির্ভূত।
৩. অনুমোদনহীন শিক্ষক মূল্যায়ন ওয়েবসাইট: ডাকসুর পক্ষ থেকে শিক্ষকদের মূল্যায়নের জন্য চালু করা ওয়েবসাইটটিকে অবৈধ বলে ঘোষণা করেছে প্রশাসন। বিবৃতিতে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের টিচিং ইভালুয়েশনের নিজস্ব নীতিমালা ইতোমধ্যে সর্বোচ্চ পর্ষদে অনুমোদিত হয়ে বাস্তবায়নের পথে রয়েছে। কোনো ছাত্র সংসদ পৃথক মূল্যায়ন কাঠামো খুলতে পারে না এবং অনুমোদনের বাইরে শিক্ষকদের ব্যক্তিগত তথ্য উন্মুক্ত করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
‘সমান্তরাল প্রশাসন বরদাস্ত করা হবে না’
প্রশাসনের বিজ্ঞপ্তিতে সতর্ক করে বলা হয়, ডাকসু গুরুত্বপূর্ণ ছাত্র সংসদ হলেও তা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও সংবিধিবদ্ধ নীতিমালার অধীন। প্রশাসনিক কর্তৃত্বকে পাশ কাটিয়ে কোনো ধরনের সমান্তরাল বা দ্বৈত প্রশাসন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হলে তা কঠোর হস্তে প্রতিহত করা হবে। ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের মর্যাদাহানি এবং শৃঙ্খলা ভঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এস এম সোহাগ ফরাজী