ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-জয়দেবপুর রুটে চালু হচ্ছে বিদ্যুতের ট্রেন: ব্যয় ৩ হাজার ৮২ কোটি টাকা, কমবে দূষণ ও জ্বালানি খরচ
যোগাযোগ ও অর্থনীতি ডেস্ক / ঢাকা: দেশের যোগাযোগব্যবস্থাকে আধুনিক, দ্রুতগামী ও পরিবেশবান্ধব করতে ডিজেল ইঞ্জিনের পরিবর্তে বৈদ্যুতিক ট্রেন চালুর ঐতিহাসিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সরকার। এর অংশ হিসেবে নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর সেকশনের ৫২ কিলোমিটার দীর্ঘ রেলপথে বৈদ্যুতিক ট্র্যাকশন (ওভারহেড ক্যাটেনারি ব্যবস্থা) চালুর একটি মেগা প্রকল্প জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য উত্থাপন করা হচ্ছে।
প্রকল্পের ব্যয় ও অর্থায়ন
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়নে প্রাক্কলিত মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৮২ কোটি ৫১ লাখ টাকা।
সরকারি অর্থায়ন (জিওবি): ৯৪২ কোটি টাকা
বৈদেশিক ঋণ সহায়তা: ২ হাজার ৮০ কোটি টাকা (এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক-এডিবি এবং ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংক-ইআইবি যৌথভাবে দেবে)
প্রাথমিকভাবে প্রকল্পের ব্যয় ৪ হাজার ২৮২ কোটি ৮৬ লাখ টাকা প্রস্তাব করা হলেও গত এপ্রিলে অনুষ্ঠিত প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় বিভিন্ন খাতের ব্যয় যৌক্তিকীকরণের মাধ্যমে ৪৬০ কোটি ৩৫ লাখ টাকা (প্রায় ১২ শতাংশ) সাশ্রয় করা হয়।
প্রকল্পের মূল অবকাঠামো ও বৈশিষ্ট্য
ট্র্যাকশন লাইন: ৫২ দশমিক ৩২ কিলোমিটার রেলপথে ওভারহেড ক্যাবল ও ক্যাটেনারি সিস্টেম নির্মাণ করা হবে।
আধুনিক কোচ সংগ্রহ: প্রতিটি ৫টি কোচের সমন্বয়ে মোট ১৬ সেট অত্যাধুনিক ইলেকট্রিক মাল্টিপল ইউনিট (ইএমইউ) বা বৈদ্যুতিক ট্রেন সংগ্রহ করা হবে।
রক্ষণাবেক্ষণ ডিপো: ট্রেনগুলোর নিয়মিত সার্ভিসিং ও দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষায় জয়দেবপুর প্রান্তে একটি আধুনিক ইএমইউ মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ কারখানা গড়ে তোলা হবে।
বাস্তবায়ন মেয়াদ: ২০৩১ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পের সম্পূর্ণ কাজ সমাপ্ত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
যেসব সুফল মিলবে
রেলওয়ে ও পরিকল্পনা বিভাগের তথ্যমতে, বৈদ্যুতিক ট্র্যাকশন চালু হলে ট্রেন যোগাযোগে বড় ধরনের রূপান্তর ঘটবে:
জ্বালানি খরচ সাশ্রয় হবে প্রায় ৪০ শতাংশ।
ট্রেনের রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ কমে আসবে।
গতিবেগ বৃদ্ধি পাবে ১৮ থেকে ২০ শতাংশ (ঘণ্টায় গতিবেগ পৌঁছাবে ৮০ থেকে ১০০ কিলোমিটারে)।
সময় সাশ্রয়ের পাশাপাশি সড়কের ওপর যানবাহনের চাপ কমবে এবং কার্বন নিঃসরণ শূন্যের কোঠায় নেমে বায়ুদূষণ রোধ হবে।
বিশেষজ্ঞের পর্যবেক্ষণ ও সতর্কবার্তা
যোগাযোগ অবকাঠামো বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান বলেন, “ভারতে বর্তমানে প্রায় ৭০ শতাংশ এবং চীনে ৯৫ শতাংশ ট্রেন বিদ্যুতে চলে। বৈশ্বিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে থাকলেও এই উদ্যোগটি অত্যন্ত সময়োপযোগী। তবে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা এবং বিশেষায়িত দক্ষ জনবল গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। অতীতের ডেমু ট্রেনের মতো রক্ষণাবেক্ষণ সংকটে যাতে এটি মুখ থুবড়ে না পড়ে, সে বিষয়ে শুরু থেকেই সতর্ক থাকতে হবে।”
ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে সম্প্রসারণের লক্ষ্য
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-জয়দেবপুর প্রকল্প সফলভাবে সম্পন্ন হলে দ্বিতীয় ধাপে অত্যন্ত ব্যস্ত ঢাকা–চট্টগ্রাম প্রধান করিডোরে বৈদ্যুতিক ট্রেনলাইন সম্প্রসারণের পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে।
এ বিষয়ে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি বলেন, “পুরো রেলব্যবস্থাকে একটি সমন্বিত ও আধুনিক নেটওয়ার্কের আওতায় এনে বর্তমান সরকার রেল খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। যাত্রীসেবার মানোন্নয়ন ও রেলের সক্ষমতা আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে অচিরেই আরও বেশ কিছু যুগান্তকারী প্রকল্প গ্রহণ করা হবে।”
এস এম সোহাগ ফরাজী