নারায়ণগঞ্জের বন্দরে ১৭ শতাংশ জমি ও ১৪৫ ধারার নিষেধাজ্ঞা নিয়ে মুখোমুখি দুই পক্ষ
স্টাফ রিপোর্ট| নারায়ণগঞ্জ
নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার মদনগঞ্জ এলাকার ৭৫ নং (নতুন) লক্ষ্যারচর রোডের ১৭ শতাংশ জমি নিয়ে একই পরিবারের শরিকদের মধ্যে গভীর আইনি বিরোধ ও মানসিক উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। একপক্ষের (১ম পক্ষ) আদালতে দায়ের করা পিটিশন মামলার প্রেক্ষিতে বিজ্ঞ অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে জারি করা হয়েছে ১৪৫ ধারার অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞা। অন্যদিকে, অন্যপক্ষের (২য় পক্ষ) দাবি—এই আইনি পেঁচকে ঢাল বানিয়ে তাঁদের নিজস্ব জমিতে মাথার ওপর ছাদ গড়ে তোলার শেষ সম্বল ও বহু বছরের স্বপ্নকে থমকে দেওয়া হয়েছে।
ঘটনার প্রেক্ষাপট ও বাদীর (১ম পক্ষ) মামলা:
আদালত ও মামলা সূত্রে জানা যায়, মদনগঞ্জের বাসিন্দা নাসরিন সুলতানা বাদী হয়ে নিজের ভাই ও স্বজন—মোঃ রহমত উল্লাহ রোমান (রুমান), শফিউল্লাহ মোহাম্মদ বাবর ও মোসাঃ ওয়াহিদা আক্তারকে ২য় পক্ষভুক্ত করে বিজ্ঞ অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, নারায়ণগঞ্জে ফৌজদারি কার্যবিধির (CrPC) ১৪৫ ধারায় একটি পিটিশন মামলা (মামলা নং-৪২৭/২০২৬, স্মারক নং-এডিএম (এন)/২৬/১২৯২) দায়ের করেন।
নালিশি জমিটি নারায়ণগঞ্জ জেলার বন্দর থানা ও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের অধীন মদনগঞ্জ ‘ম’ খণ্ড মৌজার সি.এস ২২৮, ৬৯৫ ও আর.এস ৩১৯ নং খতিয়ানের আর.এস ২০১৫ নং দাগে অবস্থিত। ১৭ শতাংশ নাল জমির চৌহদ্দির উত্তরে ৫ ফুট প্রস্থের পারিবারিক রাস্তা, দক্ষিণে মোঃ হেলু মিয়া, পূর্বে পোকাই বেপারী এবং পশ্চিমে মোঃ হাবিবুল্লাহ টগরের জমি অবস্থিত।
বাদী নাসরিন সুলতানা মামলায় দাবি করেন, নালিশি সম্পত্তি ও তার চলাচলের পথ নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে বিরোধ তৈরি হওয়ায় সার্বিক শান্তিশৃঙ্খলা বিঘ্নিত হওয়ার উপক্রম হয়েছে। বিষয়টি আমলে নিয়ে বিজ্ঞ অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কাফী বিন কবির আগামী ১৩ অক্টোবর ২০২৬ তারিখের পরবর্তী ধার্য দিন পর্যন্ত ওই নালিশা সম্পত্তিতে কোনো প্রকার পরিবর্তন, পরিবর্ধন, অবকাঠামো ধ্বংস বা রূপান্তর না করতে এবং স্ব-স্ব অবস্থানে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার নির্দেশ প্রদান করেন।
বিবাদী (২য় পক্ষ) ও ভুক্তভোগী পরিবারের আকুতি:
এদিকে ২য় পক্ষের শরিক মোহাম্মদ রহমাতুল্লাহ রুমানের পরিবার জানিয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক করুণ গল্প। বহু বছর ধরে ভাড়া বাসায় থাকার পর, রুমান তাঁর মায়ের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত ২.১০ শতাংশ জমি স্ত্রী সাজেদা আক্তার ইয়াসমিনের নামে লিখে দেন। তাঁদের দুই মেয়ে লিমা আক্তার ও তাঁর বোনের নিরাপদ ভবিষ্যতের আশ্রয় হিসেবে সেই জমিতে নিজ উদ্যমে ঘরের ইটের গাঁথুনি শুরু করেন।
কিন্তু নির্মাণকাজ অর্ধেক উঠতেই নেমে আসে আইনি জটিলতা। রহমাতুল্লাহ রুমান ও তাঁর পরিবারের অভিযোগ—
১ম পক্ষ নাসরিন সুলতানা প্রথমে তাঁদের প্রাপ্ত অংশটি কম দামে কিনে নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন।
সেই প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় জমিতে পর্যাপ্ত ‘চলাচলের রাস্তা নেই’ এমন দাবি তুলে আদালতে গিয়ে ১৪৫ ধারার নিষেধাজ্ঞা জারি করান।
তবে বিবাদী পক্ষের দাবি, স্থানীয় সামাজিক সালিশের সিদ্ধান্ত ১৫ শতাংশ জমি মেনে তাঁরা নির্ধারিত ৪ ফুট ১.৫ ইঞ্চির চেয়েও বেশি—অর্থাৎ ৪ ফুট ৬ ইঞ্চি জায়গা রাস্তার জন্য ছেড়ে দিয়েছেন।
খোলা আকাশের নিচে নষ্ট হচ্ছে কোটি টাকার স্বপ্ন:
আদালতের নিষেধাজ্ঞার কারণে থমকে গেছে ঘর নির্মাণের কাজ। ফলে উন্মুক্ত আকাশের নিচে রোদ-বৃষ্টিতে ভিজে নষ্ট হচ্ছে রড, সিমেন্ট, বালুসহ প্রায় ৩ লাখ টাকার বেশি মূল্যের নির্মাণসামগ্রী।
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের আকুতি—
“যে ঘরটি আমাদের দুই মেয়ের ভবিষ্যৎ আশ্রয় হওয়ার কথা ছিল, তা আজ শুরুতেই থেমে গেল স্বপ্ন। আমরা কোনো অন্যায় চাই না, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে আদালতের কাছে বিচার চাই যাতে দ্রুততম সময়ে সত্য উদঘাটিত হয় এবং আমরা মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু শেষ করতে পারি।”
এলাকাবাসীর অভিমত ও ভবিষ্যৎ পথরেখা:
স্থানীয় প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলে জমি ও রাস্তা নিয়ে শরিকদের মধ্যকার এই দ্বন্দের সত্যতা মিললেও, জমি জোরপূর্বক কেনা বা হয়রানির অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমেই স্পষ্ট হওয়া সম্ভব বলে মনে করছেন তারা।
বর্তমানে বিজ্ঞ আদালতের আদেশ মেনে উভয় পক্ষই শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখলেও আগামী ১৩ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে নিজ নিজ স্বত্ব ও মালিকানার কাগজপত্রাদিসহ আদালতে দুই পক্ষের হাজির হওয়ার ওপরই নির্ভর করছে এই বিরোধের আইনি নিষ্পত্তি ও একটি পরিবারের স্বপ্নের ঠিকানা পাওয়ার ভাগ্য।