মসজিদুল হারামের প্রখ্যাত মুয়াজ্জিন শেখ ইব্রাহিম আল মাদানির ইন্তেকাল
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
মক্কার পবিত্র মসজিদুল হারামের (গ্র্যান্ড মসজিদ) বিশিষ্ট ও প্রবীণ মুয়াজ্জিন শেখ ইব্রাহিম আল মাদানি ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তার আকস্মিক মৃত্যুতে মুসলিম বিশ্বে এবং হারামাইন শরিফাইন সংশ্লিষ্টদের মাঝে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
পবিত্র গ্র্যান্ড মসজিদে দীর্ঘ সময় ধরে সুললিত কণ্ঠে আজান দিয়ে তিনি বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসল্লির হৃদয় জয় করেছিলেন। মৃত্যুর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে সোমবার ভোররাতেও (ফজর) মসজিদুল হারামে তাঁর আজান দেওয়ার একটি হৃদয়স্পর্শী ভিডিও ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম ‘ইনসাইড দ্য হারামাইন’। এটি প্রকাশের পরপরই তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের আবেগাপ্লুত করে তোলে।
পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা গেছে, সোমবার আসরের নামাজের পর পবিত্র মসজিদুল হারামে লাখো মুসল্লির উপস্থিতিতে মরহুমের জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হবে। এরপর মক্কার ঐতিহাসিক আল-মুয়াল্লা কবরস্থানে তাকে চিরনিদ্রায় সমাহিত করা হবে।
শৈশব ও ধর্মীয় শিক্ষা:
মরহুম শেখ ইব্রাহিম আল মাদানি ১৯৭৬ সালে পবিত্র মদিনা মুনাওয়ারায় জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব থেকেই তিনি অত্যন্ত দ্বীনি ও তাকওয়াপূর্ণ পরিবেশে বেড়ে ওঠেন। তাঁর জীবনে সবচেয়ে গভীর প্রভাব ছিল তাঁর দাদার, যিনি ছিলেন একজন বিশিষ্ট কোরআনে হাফেজ। দাদার অনুপ্রেরণাতেই তিনি শৈশবে পবিত্র কোরআন হেফজ সম্পন্ন করেন এবং পরবর্তীতে ইসলামিক কারাতে বিশেষ করে বিভিন্ন ক্বেরাত ও কুরআন বিষয়ক অধ্যয়নে প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন।
মুয়াজ্জিন হিসেবে বর্ণাঢ্য কর্মজীবন:
মাত্র ১৫ বছর বয়সেই শেখ ইব্রাহিম আল মাদানির মুয়াজ্জিন জীবনের সূচনা হয়। মদিনার একটি স্থানীয় মসজিদে আজান দিয়ে তিনি তাঁর যাত্রা শুরু করেন। কলেজ জীবন শেষ হওয়া পর্যন্ত তিনি স্থানীয় আরও তিনজন প্রতিবেশীর সঙ্গে পালাক্রমে ওই মসজিদে মুয়াজ্জিনের দায়িত্ব আন্তরিকতার সঙ্গে পালন করেন। এরপর কর্মজীবনের শুরুতে মদিনার বাইরে শিক্ষকতার গুরুদায়িত্ব পালনের কারণে তিনি কিছু সময়ের জন্য আজান দেওয়া থেকে বিরত ছিলেন।
পরবর্তীতে ১৪২৮ হিজরিতে তাঁকে মক্কার ‘মসজিদ আল-মাদদাহ’তে পুনরায় আজান দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। সেখানে তিনি একটানা বেশ কয়েক বছর দায়িত্ব পালন করেন। অতঃপর ১৪৩৯ হিজরিতে তাঁর সুললিত কণ্ঠ, বিশুদ্ধ উচ্চারণ ও দক্ষতার স্বীকৃতিস্বরূপ আনুষ্ঠানিকভাবে পবিত্র কাবা শরিফের (মসজিদুল হারাম) মুয়াজ্জিন পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এই পরম সৌভাগ্যময় পদে দায়িত্ব পালন করে গেছেন।
আজানের অনন্য শৈলী:
মদিনায় বেড়ে ওঠার কারণে শেখ ইব্রাহিমের আজানের সুরে মদিনার শান্ত ও হৃদয়স্পর্শী ঐতিহ্যবাহী সুরের গভীর প্রভাব পরিলক্ষিত হতো। অন্যদিকে, শৈশবে বাবার সঙ্গে বারবার পবিত্র মক্কায় সফর করার সুবাদে তিনি মক্কার গ্র্যান্ড মসজিদের ঐতিহ্যবাহী ও স্বতন্ত্র উদাত্ত আজানশৈলীর সঙ্গেও নিবিড়ভাবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। এই দুই পবিত্র শহরের সুরের অপূর্ব সংমিশ্রণ ছিল তাঁর আজানের প্রধান বৈশিষ্ট্য, যা মসজিদুল হারামে উপস্থিত দেশ-বিদেশের লাখ লাখ মুসল্লিকে মুগ্ধ করত।
তাঁর প্রয়াণে মক্কা-মদিনাসহ সারাবিশ্বের বহু আলেম-উলামা ও ধর্মপ্রাণ মানুষ গভীর শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করেছেন।
(সূত্র: খালিজ টাইমস)
এস এম সোহাগ ফরাজী