সিলেটে ৩ দিন ধরে নিখোঁজ হাফিজিয়া মাদ্রাসার ২ ছাত্র: ভিডিও কলে মারধর দেখিয়ে মুক্তিপণ দাবি, থানায় জিডি
সিলেট ব্যুরো / শাহ তোফাজ্জুল হোসেন ভান্ডারী: সিলেটের খাদিমপাড়া এলাকার একটি হাফিজিয়া মাদ্রাসা থেকে নিখোঁজের তিন দিন পার হলেও দুই শিক্ষার্থীর কোনো সন্ধান মেলেনি। এরই মধ্যে এক ছাত্রের বাবাকে ইমো অ্যাপে ভিডিও কল দিয়ে ছেলেকে হাত-পা বেঁধে মারধর করার লোমহর্ষক দৃশ্য দেখিয়ে ১ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করেছে অজ্ঞাত চক্র।
এ ঘটনায় নিখোঁজ ছাত্রদের পরিবার ও মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) শাহপরান থানায় পৃথক সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে।
নিখোঁজ দুই শিক্ষার্থী
নিখোঁজ শিক্ষার্থীরা হলো—তামিম আহমেদ (১৫) ও সাঈদ মাসুদ চৌধুরী ওরফে নাঈম (১৫)। তারা উভয়েই নগরীর খাদিমপাড়াস্থ ‘জাবালে নূর হাফিজিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানা’র হিফজ বিভাগের ছাত্র।
তামিম দক্ষিণ সুরমা উপজেলার বড়াইকান্দি এলাকার মো. আবদুস সাত্তারের ছেলে এবং সাঈদ জকিগঞ্জ উপজেলার মানিকপুর ইউনিয়নের মউগ্রামের বেবুল আহমদের ছেলে।
ফজরের নামাজের সময় নিখোঁজ
মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ, পুলিশ ও পরিবার সূত্রে জানা যায়, গত মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬) ভোরে ফজরের নামাজের ফাঁকে মাদ্রাসা প্রাঙ্গণ থেকে তামিম ও সাঈদ রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়। এরপর আত্মীয়স্বজনসহ সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেও তাদের কোনো সন্ধান মেলেনি।
জাবালে নূর হাফিজিয়া মাদ্রাসার পরিচালক তোফায়েল আহমেদ জানান, “ফজরের নামাজের সময় দুই ছাত্র একসঙ্গে বের হয়ে যায়। ইতিপূর্বে তামিম না বলে আরও দুবার বাসায় চলে গিয়েছিল, পরে অভিভাবকরা তাকে ফিরিয়ে দেন। তবে এবার তারা দুজনই নিখোঁজ থাকায় বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে স্বজনদের অবগত করা হয়।”
ইমোতে ভিডিও কলে নির্যাতন ও মুক্তিপণ দাবি
এদিকে নিখোঁজ সাঈদের বাবা বেবুল আহমদ এক লোমহর্ষক তথ্য দিয়ে জানান, নিখোঁজের পর চারদিকে সন্ধান করেও যখন ছেলের হদিস মিলছিল না, তখন বৃহস্পতিবার সকালে তাঁর মুঠোফোনের ইমো অ্যাপে একটি নম্বরবিহীন আইডি থেকে ভয়েস মেসেজ পাঠিয়ে টাকা চাওয়া হয়।
তিনি বলেন, “বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর চক্রটি সরাসরি ইমোতে ভিডিও কল দিয়ে আমার ছেলেকে হাত-পা বেঁধে বেধড়ক মারধর করার দৃশ্য দেখায় এবং মারধরের একটি ভিডিও ক্লিপ পাঠায়। এরপর একটি বিকাশ নম্বর দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে এক লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে হুমকি দেওয়া হয় যে, টাকা না পাঠালে ছেলেকে মেরে ফেলা হবে। আমি আমার ছেলেকে জীবিত ফেরত পেতে প্রশাসনের সর্বাত্মক হস্তক্ষেপ কামনা করছি।”
অন্যদিকে নিখোঁজ তামিমের পিতা আবদুস সাত্তার বুকফাটা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “ছেলেটা এর আগে বাড়ি চলে এসেছিল, এবার কোথায় গেল বুঝতে পারছি না। আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না আমার ছেলে বেঁচে আছে কি না।”
পুলিশের তদন্ত ও সতর্কতা
শাহপরান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফেরদৌস আহমেদ জানান, শিক্ষার্থীদের নিখোঁজের বিষয়ে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ ও অভিভাবকরা থানায় জিডি করেছেন। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে এবং সারা দেশের সকল থানায় দুই ছাত্রের ছবি ও তথ্য পাঠানো হয়েছে।
ভিডিও কলে মুক্তিপণ দাবির বিষয়ে ওসি বলেন, “ইমোতে যে বিকাশ নম্বর দেওয়া হয়েছিল, প্রযুক্তিগত অনুসন্ধানে দেখা গেছে সেটি দীর্ঘ প্রায় এক বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। নিখোঁজের ঘটনা ঘটলে অনেক সময় সুযোগসন্ধানী কোনো সাইবার প্রতারক চক্র এমন পরিস্থিতি তৈরি করে ফায়দা লোটার চেষ্টা করে। তাছাড়া প্রেরিত ভিডিওটিও বেশ অস্পষ্ট। বিষয়টি কোনো অপহরণচক্রের কাজ নাকি নিখোঁজ হওয়ার সুযোগ নিয়ে কোনো প্রতারক চক্র টাকা হাতানোর ফন্দি করছে, তা প্রযুক্তিগত নজরদারির মাধ্যমে গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”
এস এম সোহাগ ফরাজী