সিলেটে নাটকীয় সমাপ্তি: নিখোঁজ দুই মাদ্রাসা ছাত্র জৈন্তাপুরের রেস্টুরেন্ট থেকে উদ্ধার, পড়ার অনাগ্রহ থেকেই আত্মগোপন
সিলেট ব্যুরো / শাহ তোফাজ্জুল হোসেন ভান্ডারী: সিলেটে নিখোঁজের চার দিন পর এবং ভিডিও কলে মারধর দেখিয়ে মুক্তিপণ দাবির চাঞ্চল্যকর ঘটনার মধ্যেই নিখোঁজ দুই মাদ্রাসা ছাত্রকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করেছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব-৯)। মাদ্রাসায় পড়ার আগ্রহ না থাকায় তারা স্বেচ্ছায় আত্মগোপনে গিয়ে একটি খাবারের হোটেলে কাজ নিয়েছিল বলে জানিয়েছে র্যাব।
শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার ফতেহপুর ইউনিয়নের হরিপুর বাজারে অবস্থিত ‘মায়ের দোয়া শাহজালাল রেস্টুরেন্ট’-এ অভিযান চালিয়ে তাদের উদ্ধার করা হয়।
উদ্ধার হওয়া দুই শিক্ষার্থী
উদ্ধারকৃত শিক্ষার্থীরা হলো—সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার উত্তর মনসুরপুর গ্রামের বেবুল আহমদের ছেলে মো. সাইদ মাসুদ চৌধুরী নাঈম (১৫) এবং সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার বড়বন গ্রামের আব্দুস সাত্তারের ছেলে মো. তামিম আহমদ (১৫)। তারা উভয়েই সিলেট নগরীর খাদিমপাড়াস্থ ‘জাবালে নূর হাফিজিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানা’র হিফজ বিভাগের ছাত্র ছিল।
ফজরের নামাজের পর স্বেচ্ছায় প্রস্থান
র্যাব ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ১৫ সেপ্টেম্বর ভোরে ফজরের নামাজের সময় ওই দুই কিশোর কাউকে না জানিয়ে মাদ্রাসা থেকে বের হয়ে যায়। নির্ধারিত সময়ে তাদের না পেয়ে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ পরিবারের সাথে যোগাযোগ করে। আত্মীয়স্বজনসহ নানা স্থানে খোঁজাখুঁজি করে কোনো সন্ধান না পেয়ে তাদের অভিভাবকরা শাহপরাণ থানায় পৃথক সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।
এরপর গত ১৭ সেপ্টেম্বর নাঈমের বাবার মুঠোফোনের ইমো অ্যাপে একটি অপরিচিত আইডি থেকে ভয়েস মেসেজ পাঠিয়ে এক লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। পরবর্তীতে ভিডিও কলে হাত-পা বেঁধে এক কিশোরকে মারধরের দৃশ্য দেখানো ও ভিডিও ক্লিপ পাঠানোর ঘটনায় সিলেটে তোলপাড় শুরু হয়।
ছায়া তদন্তে রহস্যভেদ
ঘটনাটির গুরুত্ব বিবেচনা করে র্যাব-৯ গোয়েন্দা নজরদারি ও ছায়া তদন্ত শুরু করে। একপর্যায়ে সুনির্দিষ্ট গোপন সংবাদের ভিত্তিতে শনিবার বিকেলে হরিপুর বাজারের ওই রেস্টুরেন্টে অভিযান চালিয়ে দুই কিশোরকে কর্মরত অবস্থায় উদ্ধার করে র্যাব সদস্যরা।
র্যাব-৯ এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) কে এম শহিদুল ইসলাম সোহাগ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে দুই কিশোর জানিয়েছে—মাদ্রাসায় পড়তে ভালো না লাগায় তারা নিজেরাই পালিয়ে জৈন্তাপুরের হরিপুর বাজারে চলে যায় এবং বাঁচার তাগিদে রেস্টুরেন্টে কাজ শুরু করে। তাদের মধ্যে একজন এর আগেও দুইবার মাদ্রাসা থেকে পালিয়েছিল।
ভিডিওতে মুক্তিপণ দাবি ছিল প্রতারণা চক্রের ফাঁদ
ইমোতে মারধরের ভিডিও ও মুক্তিপণ দাবির বিষয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কে এম শহিদুল ইসলাম সোহাগ বলেন, “উদ্ধারকৃত কিশোরদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তারা জানায় যে পাঠানো ভিডিওটি তাদের নয় এবং তারা এ ধরনের কোনো ভিডিও বা বার্তা পাঠায়নি। নিখোঁজের ঘটনা এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার পর সুযোগসন্ধানী কোনো সাইবার প্রতারক চক্র অন্য কোনো শিশুর নির্যাতনের ভিডিও পাঠিয়ে অভিভাবকের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে টাকা হাতানোর চেষ্টা করেছিল। এই প্রতারক চক্রটিকে শনাক্ত ও গ্রেফতারে র্যাবের অভিযান চলছে।”
আইনি প্রক্রিয়া শেষে উদ্ধারকৃত দুই শিক্ষার্থীকে তাদের পরিবারের জিম্মায় হস্তান্তর করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।
এস এম সোহাগ ফরাজী