তৌহিদী জনতার বাধা ও প্রতিবাদ উপেক্ষা করে কুশিয়ারায় ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ সম্পন্ন: নওয়াই বাংলালিংক চ্যাম্পিয়ন, নদীর দুই পাড়ে জনতার ঢল
সিলেট ও গোলাপগঞ্জ ব্যুরো: স্থানীয় ‘তৌহিদী জনতা’র শত বাধা, আপত্তি ও কড়া প্রতিবাদ উপেক্ষা করে সিলেটের গোলাপগঞ্জের কুশিয়ারা নদীতে অত্যন্ত উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল আবহমান বাংলার ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা। টানটান উত্তেজনার ফাইনালে ‘হাকালুকির বাঘ’ নৌকাকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে ‘নওয়াই বাংলালিংক’।
শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬) দুপুর ২টা থেকে গোলাপগঞ্জ উপজেলার মীরগঞ্জ সংলগ্ন কুশিয়ারা নদীর বুকে এই রোমাঞ্চকর নৌকাবাইচ শুরু হয়।
৬ দলের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই ও ফল
আশপাশের কয়েকটি গ্রামের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই প্রতিযোগিতায় মোট ৬টি সুসজ্জিত ও শক্তিশালী বাইচের দল অংশ নেয়। ঢাক-ঢোল ও বৈঠার তালে তালে সারি গান গেয়ে মাঝিমাল্লারা যখন কুশিয়ারার বুকে পাল্লা দিয়ে নৌকা ছুটিয়ে দেন, তখন নদীর দুই পাড়ে সমবেত হাজারো দর্শকের করতালি ও হর্ষধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্বে ‘হাকালুকির বাঘ’ নৌকাকে পেছনে ফেলে প্রথম স্থান অধিকার করে ‘নওয়াই বাংলালিংক’। বাইচ শেষে আমন্ত্রিত অতিথিদের উপস্থিতিতে বিজয়ী দলের হাতে আকর্ষণীয় পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়।
উৎসবের আমেজ ও জনস্রোত
নৌকাবাইচকে কেন্দ্র করে দুপুর থেকেই কুশিয়ারা নদীর দুই পাড়সহ পার্শ্ববর্তী ব্রিজ ও নৌযানগুলোতে বিপুলসংখ্যক নারী-পুরুষ ও শিশুর ঢল নামে। কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা ছাড়াই অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ, সুশৃঙ্খল ও আনন্দঘন পরিবেশে দর্শক-সমর্থকরা দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে এই ঐতিহ্যবাহী আয়োজন উপভোগ করেন।
বাধায় অনড় ছিল প্রশাসন
এর আগে শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) জুমার নামাজের পর নৌকাবাইচকে ‘অনৈসলামিক’ আখ্যা দিয়ে তা বন্ধের দাবিতে মীরগঞ্জ বাজারে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছিল ‘তৌহিদী জনতা’। স্থানীয় একাধিক কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা এতে অংশ নিয়ে বাইচ বন্ধে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ দাবি করেন।
তবে সেই দাবি নাকচ করে দিয়ে গোলাপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রফিকুল ইসলাম স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন, “নৌকাবাইচ বাঙালির শত বছরের লোকজ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি কোনোভাবেই বন্ধ হতে দেওয়া হবে না। নিজস্ব সংস্কৃতি চর্চা রুদ্ধ হলে বিজাতীয় সংস্কৃতি সমাজকে গ্রাস করবে। তাই কুশিয়ারায় আনন্দমুখর পরিবেশেই নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হবে।” প্রশাসনের সেই অনড় অবস্থান ও কঠোর নজরদারির ফলেই নির্বিঘ্নে সফল হলো এই লোকজ উৎসব।
উল্লেখ্য, এর আগে সিলেটের বিয়ানীবাজারে সুনাই নদীর নৌকাবাইচ বন্ধেও তৌহিদী জনতার ব্যানারে একই ধরনের বিরোধিতা করা হয়েছিল। তবে প্রশাসনের বলিষ্ঠ সহযোগিতায় গত ২৮ আগস্ট হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে সেখানেও অত্যন্ত বর্ণাঢ্য আয়োজনে নৌকাবাইচ সম্পন্ন হয়েছিল।
এস এম সোহাগ ফরাজী