খিলক্ষেতে শিকল ও বেল্ট দিয়ে অমানুষিক নির্যাতন, ২ সন্তানের জননীকে হত্যার অভিযোগে স্বামী গ্রেপ্তার
স্টাফ রিপোর্টার: শাহ তোফাজ্জুল হোসেন ভান্ডারী, দৈনিক জীবনযাত্রা
ঢাকা:
রাজধানীর খিলক্ষেতে পায়ে লোহার শিকল বেঁধে ও চামড়ার বেল্ট দিয়ে অমানুষিক নির্যাতনের দুই দিন পর মুক্তা ইসলাম (২৮) নামের এক গৃহবধূর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে নিহতের স্বামী সোহেল শিকদারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। স্ত্রীকে পাশবিকভাবে মারধরের লোমহর্ষক ভিডিও ধারণ করে শ্যালকের মুঠোফোনে পাঠিয়েছিলেন অভিযুক্ত স্বামী।
গত বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) খিলক্ষেতের ৫ নম্বর সড়কের ৩৯ নম্বর বাড়ির তৃতীয় তলার একটি ভাড়া ফ্ল্যাট থেকে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় মুক্তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহত মুক্তা বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা এবং দুই সন্তানের জননী।
মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় মুক্তার ছোট ভাই তানভীর রহমান বাদী হয়ে খিলক্ষেত থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। পরিবারের সুস্পষ্ট অভিযোগ, পরিকল্পিতভাবে দীর্ঘ সময় নির্যাতন চালিয়ে মুক্তাকে হত্যা করার পর ঘটনাটি আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দিতে লাশ ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।
হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার পূর্বে ধারণ করা প্রায় তিন মিনিটের একটি ভয়ংকর ভিডিও পুলিশের হাতে এসেছে। ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, মুক্তার পা লোহার শিকল দিয়ে শক্ত করে খাটের পায়ার সঙ্গে বাঁধা। এ অবস্থায় তাঁর ওপর চামড়ার বেল্ট দিয়ে অবিরাম আঘাত চালাচ্ছেন স্বামী সোহেল। পাশের কক্ষে তখন তাদের দুই অবুঝ শিশুসন্তান ভয়ে কান্নাকাটি করছিল।
ভিডিওতে অভিযুক্ত সোহেলকে আক্রোশের সঙ্গে চিৎকার করে বলতে শোনা যায়, ‘কথা ক, কথা ক, তোরে আজ পিটাইয়া মাইরা ফালামু’। মারধরের মুখে যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে মুক্তা বলছিলেন, ‘আমি কিছু করিনি। আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি।’ এমনকি নির্মম নির্যাতনের মুখেও মাতৃত্বের আকুতি জানিয়ে মুক্তা স্বামীকে বলেন, ‘আমাকে মারবা ঠিক আছে, শুধু দুই বাচ্চারে ঘুম পাড়িয়ে আসি।’
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত ১ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে স্ত্রীকে শিকল ও বেল্ট দিয়ে পেটাতে পেটাতে নিজেই সেই দৃশ্য ভিডিও করেন সোহেল। পরবর্তীতে ভিডিওটি মুক্তার ভাই তানভীরের হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়ে লেখেন, ‘তোমার বোনকে নিয়ে যাও’। ঘটনার পর পুলিশ অভিযান চালিয়ে সোহেলকে গ্রেপ্তার করে এবং তাঁর ব্যবহৃত মুঠোফোনটি জব্দ করে। জব্দকৃত মোবাইলেও নির্যাতনের ওই ভিডিও সংরক্ষিত পাওয়া গেছে।
নিহতের স্বজনরা জানান, সোহেল প্রথমে মুদি দোকান এবং পরে এমব্রয়ডারির ব্যবসা পরিচালনা করতেন। ব্যবসায় লোকসানের পর থেকেই তাঁদের সংসারে অশান্তি ও কলহ শুরু হয়। কয়েক মাস আগে মুক্তার ভাইয়ের কাছে ৩ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করেন সোহেল। দাবি অনুযায়ী টাকা দিতে না পারায় মুক্তার ওপর নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হতো। পাশাপাশি স্ত্রীর প্রতি ভিত্তিহীন পরকীয়ার সন্দেহ থেকেও এই বর্বরতা চালানো হয়।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও খিলক্ষেত থানার উপপরিদর্শক (এসআই) রাজীব ভৌমিক জানান, “মরদেহ উদ্ধারের দুই দিন আগের অমানুষিক মারধরের অকাট্য ভিডিও প্রমাণ পাওয়া গেছে। তবে ওই নির্যাতনের ফলেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে নাকি শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে, তা ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এলে নিশ্চিত হওয়া যাবে। গ্রেপ্তার সোহেল দাবি করছেন মুক্তা আত্মহত্যা করেছেন। বিষয়টি পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”
এস এম সোহাগ ফরাজী