মেয়ের বিয়ের জমি বিক্রির ৫ লাখ টাকা নিয়ে ঢাকায় আসছিলেন ইসমাইল: এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে মিলল মুখে স্কচটেপ মোড়ানো মরদেহ, টাকা উধাও
স্টাফ রিপোর্টার / শাহ তোফাজ্জুল হোসেন ভান্ডারী: ছোট মেয়ের বিয়ের খরচ মেটাতে ভিটেবাড়ির জমি বিক্রি করে অবশিষ্ট নগদ ৫ লাখ টাকা সঙ্গে নিয়ে ঢাকায় ফিরছিলেন মো. ইসমাইল হোসেন (৫০)। কিন্তু মেয়ের বিয়ের দিনক্ষণ চূড়ান্ত করে সানাইয়ের সুর বাজানোর আগেই ঘাতক বা ছিনতাইকারী চক্রের নির্মম থাবায় চিরতরে থেমে গেল তাঁর জীবনযাত্রা।
রাজধানীর ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের বনানী অংশ থেকে মুখে স্কচটেপ পেঁচানো অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে তাঁর মরদেহ। এ সময় তাঁর কাছে থাকা জমি বিক্রির নগদ ৫ লাখ টাকা, দুটি মোবাইল ফোন ও সাথে থাকা ব্যাগটির কোনো হদিস মেলেনি।
শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬) সকাল ৮টার পর এক্সপ্রেসওয়ের ওপর থেকে মরদেহটি উদ্ধার করে বনানী থানা পুলিশ। পরে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
নিহতের পরিচয়
নিহত মো. ইসমাইল হোসেন জামালপুর সদর উপজেলার হবদেশ গ্রামের জালাল উদ্দিনের ছেলে। তিনি আগে ডেল্টা স্পিনিং মিলে নিরাপত্তাকর্মী (সিকিউরিটি গার্ড) হিসেবে চাকরি করতেন। শারীরিক অসুস্থতার কারণে প্রায় নয় মাস আগে তিনি চাকরি ছাড়েন। এরপর পরিবার নিয়ে কিছুদিন কাশিমপুরে বসবাসের পর গত চার মাস ধরে তিনি জামালপুরের গ্রামের বাড়িতে একাই অবস্থান করছিলেন। তাঁর স্ত্রী, ছেলে, পুত্রবধূ ও অবিবাহিত মেয়ে গাজীপুরে বসবাস করেন।
জমি বিক্রি ও নিখোঁজ ৫ লাখ টাকা
নিহতের বড় ছেলে মো. হাসান জানান, ছোট বোন শারমিনের বিয়ের কথাবার্তা চূড়ান্ত করতেই মূলত তাঁর বাবা ঢাকায় আসছিলেন। মেয়ের বিয়ের খরচের টাকা জোগাতে সম্প্রতি তিনি গ্রামের ১১ শতাংশ জমি সাড়ে ১০ লাখ টাকায় বিক্রি করেন। সেই টাকা থেকে কিছু ঋণ পরিশোধ এবং গ্রামের বাড়ির ঘরের কাজ শেষ করে অবশিষ্ট নগদ ৫ লাখ টাকা নিজের কাছে রেখেছিলেন।
বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত সাড়ে ৩টার দিকে ওই নগদ ৫ লাখ টাকা, একটি অ্যান্ড্রয়েড ও একটি বাটন ফোন এবং প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের ব্যাগ নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে জামালপুরের বাড়ি থেকে রওনা হন ইসমাইল হোসেন।
স্বজনদের অপেক্ষা ও মর্মান্তিক পরিণতি
ছেলে হাসান বলেন, “বৃহস্পতিবার রাত ১১টার দিকে বাবা শেষবার ফোন করে বলেছিলেন সকালে তিনি সরাসরি গাজীপুরের জিরানীতে পৌঁছাবেন। আমি সকাল থেকে জিরানী বাসস্ট্যান্ডে বাবার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। কিন্তু সকাল থেকেই বাবার দুটি ফোনই বন্ধ পাই। পরে বনানী থানা পুলিশ জামালপুরের স্থানীয় ফাঁড়িতে খবর দিলে আমরা জানতে পারি—বাবার মুখে স্কচটেপ মোড়ানো মরদেহ বনানীতে এক্সপ্রেসওয়ের ওপর পাওয়া গেছে। বাবার পরনে শুধু শার্ট আর লুঙ্গি ছিল; টাকা, মোবাইল কিংবা ব্যাগ—কিছুই পাওয়া যায়নি।”
পুলিশের বক্তব্য ও তদন্ত
বনানী থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) নজরুল ইসলাম তালুকদার জানান, সুরতহাল শেষে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠানো হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড অথবা সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী, অজ্ঞান পার্টি কিংবা মলম পার্টির কাজ। সর্বস্ব লুটে নিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করে এক্সপ্রেসওয়ের মতো সুরক্ষিত জায়গায় মরদেহ ফেলে গেছে অপরাধীরা।
পুলিশ আরও জানিয়েছে, এক্সপ্রেসওয়ের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে অপরাধীদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি লুণ্ঠিত ৫ লাখ টাকা ও মোবাইল ফোন উদ্ধারে পুলিশের একাধিক দল কাজ করছে।