লিল্লার টাকা নিয়ে চিল্লাচিল্লি নয়, গরিবের চিকিৎসা নিয়ে সোচ্চার হোন
শাহ তোফাজ্জুল হোসেন ভান্ডারী:
আমি একজন সচেতন ও সাধারণ নাগরিক হিসেবে সম্পূর্ণ নিজস্ব বিবেক ও নাগরিক দায়বদ্ধতা থেকে মনের কিছু কথা তুলে ধরছি।
লিল্লার টাকা নিয়ে চিৎকার-চেঁচামেচি করে প্রকৃতপক্ষে সাধারণ মানুষের কোনো স্থায়ী লাভ নেই। লিল্লা কিংবা দানের অর্থ যারা আত্মসাৎ করে বা অন্যায়ভাবে খায়, তারা এর জবাব সরাসরি মহান আল্লাহর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েই দেবে।
হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারের দান বাক্সের অর্থ নিয়ে আপনারা যারা এতদিন বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে কথা বলেছেন, আন্দোলন করেছেন কিংবা রাজপথে প্রতিবাদ জানিয়েছেন—আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ ও শুকরিয়া। আপনাদের এই তৎপরতার কারণেই বিষয়টি নিয়ে একটি যৌক্তিক সুরাহা হয়েছে এবং সরকার ইতোমধ্যে একটি সুস্পষ্ট প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। রাষ্ট্র যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা নিশ্চয়ই সার্বিক দিক ভেবেচিন্তেই নিয়েছে। আমি মনে করি, মাজারের দানের অর্থের বিষয়ে বিতর্কের এখানেই আনুষ্ঠানিক ইতি টানা উচিত।
এখন সময় এসেছে এই সম্মিলিত শক্তিকে ঘুরিয়ে দিয়ে প্রকৃত গরিব, অসহায় ও অধিকারবঞ্চিত মানুষের মৌলিক সমস্যাগুলোর দিকে নজর দেওয়ার।
আপনারা একবার চোখ মেলে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বর্তমান অবস্থার দিকে তাকান। এটি পুরো সিলেট বিভাগের সাড়ে চার কোটি মানুষের চিকিৎসা সেবার সবচেয়ে বড় ও প্রধান ভরসাস্থল। অথচ সেখানে গিয়ে দেখলে কলিজা কেঁপে ওঠে—প্রতিদিন হাজার হাজার হতদরিদ্র রোগী ন্যূনতম মানবিক স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগীরা দিন-রাত অসহায় অবস্থায় হাসপাতালের নোংরা মেঝেতে ও বারান্দায় কাতরাচ্ছেন। সরকারি ওষুধ নেই, কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসকের সেবা পাওয়া যায় না, জরুরি এক্স-রে মেশিন কিংবা আল্ট্রাসোনোগ্রাফি বিকল—সব মিলিয়ে সরকারি স্বাস্থ্যসেবার মান নেমে গেছে তলানিতে। সেখানে দুর্নীতি ও অনিয়মের যেন কোনো শেষ নেই।
কই, এসব চরম জনদুর্ভোগ ও অনিয়ম নিয়ে তো কাউকে এমন ঐক্যবদ্ধ হয়ে জোরালো প্রতিবাদ করতে দেখি না?
আমার ব্যক্তিগত ও স্পষ্ট অভিমত হলো—যেখানে প্রতিবাদ গড়ে তুললে দেশ ও দেশের সাধারণ মানুষের সরাসরি উপকার হবে, অধিকারবঞ্চিত মানুষের মুখে হাসি ফুটবে, আপনারা সেখানেই বলিষ্ঠ কণ্ঠে সোচ্চার হোন। আপনারা প্রতিদিন ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আসুন, সরেজমিন খোঁজ-খবর নিন, চিকিৎসাবঞ্চিত সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ান এবং প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিরোধ গড়ে তুলুন।
এতে সামগ্রিকভাবে দেশের জনগণ উপকৃত হবে। হাজার হাজার গরিব, অসহায় ও চিকিৎসা না পাওয়া রোগী নতুন জীবন ফিরে পাবে। আপনারা মানুষের অন্তরের দোয়া পাবেন এবং আল্লাহর পক্ষ থেকেও এসব প্রতিবাদীদের ওপর অপার রহমত বর্ষিত হবে।
অযথা মাজার-খানকার দান-খয়রাত কিংবা লিল্লার টাকা নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে বাগ্যুদ্ধ করে না আল্লাহর কোনো ফায়দা হবে, না কোনো সাধারণ মানুষের উপকারে আসবে।
দেশে সীমাহীন দুর্নীতিতে নিমজ্জিত এমন বড় বড় বহু সরকারি জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেখানে কোনো সাধারণ নাগরিক অনিয়মের বিরুদ্ধে মুখ খুললে বা প্রতিবাদ করতে গেলে নানা আক্রমণের শিকার হতে হয়। আমি চাই, সচেতন নাগরিক সমাজ সেই সব স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নিজেদের প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর জোরালো করুক।
তাই আসুন, মাজারের দানের অর্থের মতো মীমাংসিত বিষয় নিয়ে আর বাড়াবাড়ি না করে, সিলেট ওসমানী হাসপাতালের করুণ পরিস্থিতির দিকে মনেপ্রাণে নজর দিই। যে প্রতিবাদে দেশ ও আপামর জনগণের প্রকৃত মঙ্গল নিহিত, সেই সব স্থানে সোচ্চার হওয়ার জন্য আমি সকলের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি।
এটি কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; সরেজমিনে হাসপাতালে ঘুরে সাধারণ মানুষের চরম দুর্ভোগ নিজ চোখে প্রত্যক্ষ করে হৃদয়ের গভীর রক্তক্ষরণ থেকেই এই সত্য কথাগুলো বললাম। ভুলত্রুটি হলে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।
এস এম সোহাগ ফরাজী