যুদ্ধ থেকে আজকের বাংলাদেশ: নিরাপত্তা সংকট, সামাজিক অবক্ষয় ও চলমান বাস্তবতা নিয়ে নাগরিক ভাবনা
মত ও বিশ্লেষণ ডেস্ক: বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, চৌষট্টির দাঙ্গা প্রতিরোধ কিংবা একাত্তরের রক্তক্ষয়ী মহান মুক্তিযুদ্ধ—বাংলার ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে সব ধর্ম ও বর্ণের মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছে। কিন্তু স্বাধীনতার অর্ধশতক পেরিয়ে এসেও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সংকট, নারীর নিরাপত্তা নিয়ে গভীর শঙ্কা, অব্যাহত ধর্ষণ ও খুন এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা ক্ষোভ ও প্রশ্ন উঠছে।
সম্প্রতি ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে ফুল দিতে গিয়ে গ্রেপ্তার হওয়া সুমা বড়াল (ডলি)-র প্রসঙ্গ এবং সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নানা নাগরিক ক্ষোভের প্রেক্ষিতে আইনশৃঙ্খলার দীর্ঘমেয়াদি সংকট ও রাজনৈতিক রূপান্তর নিয়ে জনমনে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে।
ধর্মীয় সম্প্রীতি ও একাত্তরের চেতনা
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান নির্বিশেষে সকল বাঙালি বৈষম্য ও শোষণের বিরুদ্ধে এক হয়ে যুদ্ধ করেছিল। সেখানে কোনো জাতি বা ধর্মীয় বিভেদ ছিল না। তবে স্বাধীনতা-পরবর্তী বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক মেরুকরণ, ক্ষমতার লড়াই এবং স্বার্থান্বেষী মহলের ইন্ধনে সাম্প্রদায়িক ইস্যুকে ঢাল হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর স্বার্থে হয়নি; তবে যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে সংখ্যালঘুদের জমি দখল, ঘরবাড়িতে হামলা বা নাগরিক নিরাপত্তার অভাব প্রশ্নবিদ্ধ করেছে মুক্তিযুদ্ধের সার্বজনীন চেতনাকে।
অপরাধের চরিত্র ও বিচারের সংকট
৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার ও তাদের এদেশীয় দোসররা নারীদের ওপর বর্বরোচিত নির্যাতন চালিয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধ শেষ হলেও দেশে নারী নির্যাতন ও ধর্ষণ থেমে থাকেনি। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, ধর্ষণ বা নারীর ওপর সহিংসতা কোনো ভৌগোলিক বা একক রাজনৈতিক শক্তির অপরাধ নয়; এটি মূলত পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা, বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং অপরাধীর রাজনৈতিক আশ্রয়ের বিষময় ফল। খুলনার কুখ্যাত এরশাদ শিকদারের মতো অপরাধীর ফাঁসি হলেও অপরাধের কাঠামো বিলুপ্ত হয়নি, কারণ সমাজে আইন প্রয়োগের চেয়ে ক্ষমতার প্রভাব বিস্তারের চর্চা অব্যাহত রয়েছে।
স্বৈরাচার পতন ও অন্তর্বর্তীকালীন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ
দীর্ঘ ১৭ বছরের স্বৈরাচারী শাসন অবসানের পরও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন না হওয়া নিয়ে সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে বড় ধরনের হতাশা কাজ করছে।
অপরাধের পরিসংখ্যান বনাম রিপোর্টিং: স্বৈরাচারী শাসনামলে গণমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ, মামলা না নেওয়া এবং পুলিশি ভীতি থাকায় অনেক অপরাধের তথ্য প্রকাশিত হতো না। তবে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের পর দীর্ঘদিনের তৈরি হওয়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মনোবল সংকট, অস্ত্র উদ্ধার না হওয়া এবং প্রশাসনিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে অপরাধী চক্রগুলো সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
নিরাপত্তার সংকট: স্বৈরাচারের পতনের পর জনগণের প্রত্যাশা ছিল দ্রুত শান্তি ও জানমালের শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। কিন্তু সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নানামুখী চেষ্টা সত্ত্বেও চুরি, ডাকাতি, খুন ও রাজনৈতিক সংঘাত জনজীবনে চরম নিরাপত্তাহীনতা ও ভীতি তৈরি করছে।
নিরাপত্তা বনাম কর্তৃত্ববাদ
অতীতের কর্তৃত্ববাদী শাসনামলে ‘স্থিতিশীলতা’ বা ‘নিরাপত্তা’র নামে যা দেখানো হতো, তার পেছনে ছিল বিরোধী মত দমন, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মতো মানবাধিকার লঙ্ঘন। অন্যদিকে, গণতান্ত্রিক রূপান্তরের অন্তর্বর্তীকালে আইনের কঠোর প্রয়োগ ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলার ঘাটতি সাধারণ মানুষের মাঝে প্রশ্ন তুলছে—তাহলে প্রকৃত নিরাপত্তা কোথায়?
একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক দেশে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা সরকারের প্রতি অন্ধ অনুরাগ নয়, বরং আইনের শাসন, দ্রুত বিচার এবং প্রতিটি নাগরিকের ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে জানমালের নিশ্চয়তাই রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব। জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুফল কখনোই সাধারণ মানুষের কাছে অর্থবহ হয়ে উঠবে না।
এস এম সোহাগ ফরাজী।