বাঙ্গরায় ‘ডাকাত পড়েছে’ মাইকিং করে সাবেক ইউপি সদস্যকে কুপিয়ে-পিটিয়ে হত্যা: পূর্ববিরোধের জেরে রক্তক্ষয়ী পরিণতি
কুমিল্লা ব্যুরো / শাহ তোফাজ্জুল হোসেন ভান্ডারী: কুমিল্লার নবগঠিত বাঙ্গরা উপজেলায় মধ্যরাতে মসজিদের মাইকে ‘ডাকাত পড়েছে’ ঘোষণা দিয়ে শ্রীকাইল ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য ও ওয়ার্ড যুবলীগের সাবেক সভাপতি আনোয়ার হোসেনকে (৪৮) ঘরে ঢুকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে।
রবিবার (১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬) দিবাগত রাত আনুমানিক ৪টার দিকে উপজেলার উত্তর পেন্নাই গ্রামে এ বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। নিহত আনোয়ার হোসেন উত্তর পেন্নাই গ্রামের মৃত মনু মিয়ার ছেলে।
রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও দীর্ঘদিনের বিরোধ
স্থানীয় বাসিন্দা ও নিহতের পরিবার সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের সংসদ নির্বাচনে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রার্থিতা নিয়ে সাবেক ইউপি সদস্য ফিরোজ হোসেন ও আনোয়ার হোসেনের মধ্যে বিরোধের সূত্রপাত হয়। নির্বাচনের পর থেকেই এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে ছিলেন আনোয়ার। সরকার পরিবর্তনের পর তিনি কয়েকবার এলাকায় ফেরার চেষ্টা চালান।
নিহতের স্ত্রী মোমেনা বেগম অভিযোগ করে বলেন, তাঁর স্বামী দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকার পর শনিবার গভীর রাতে গোপনে বাড়ি ফেরেন। খবর পেয়ে রাত সাড়ে ৩টার দিকে সাবেক ইউপি সদস্য ফিরোজ হোসেনের নেতৃত্বে একদল সশস্ত্র ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্র ও লাঠিসোঁটা নিয়ে ঘরের দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকে। হামলাকারীরা আনোয়ারকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে ও পিটিয়ে গুরুতর জখম করে। স্বামীকে বাঁচাতে গেলে তাঁকেও মারধর করা হয়।
মোমেনা বেগম আরও অভিযোগ করেন, নৃশংস হামলার পর ঘটনা আড়াল করতে গ্রামের মসজিদের মাইকে এলাকায় ‘ডাকাত পড়েছে’ বলে বিভ্রান্তিকর ঘোষণা দেওয়া হয়। এমনকি রক্তাক্ত স্বামীকে তাৎক্ষণিকভাবে হাসপাতালে নিতে চাইলে স্বজনদের অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। পরে পুলিশের সহায়তায় সকাল ৬টার দিকে তাঁকে উদ্ধার করে মুরাদনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. নাজমুস শাকিল জানান, হাসপাতালে আনার আগেই অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ও শারীরিক আঘাতে তাঁর মৃত্যু হয়েছে।
চাঁদাবাজির অভিযোগ পরিবারের
নিহতের চাচাতো ভাই মো. জসিম উদ্দিন ও মেয়ের জামাতা মো. শফিকুল ইসলাম অভিযোগ করেন, এলাকায় ফেরার শর্ত হিসেবে আনোয়ারের কাছে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করা হয়েছিল। চাঁদা না পেয়ে পরিকল্পিতভাবে মধ্যরাতে পরিকল্পিত হামলা চালিয়ে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। নিহতের পরিবার এ ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও ফাঁসির দাবি জানিয়েছে।
অভিযুক্তের দাবি ও পুলিশের অবস্থান
হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করে সাবেক ইউপি সদস্য ফিরোজ হোসেন দাবি করেন, বিগত সময়ে আনোয়ারের একক আধিপত্য ও নানা কর্মকাণ্ডে স্থানীয় গ্রামবাসী ক্ষুব্ধ ছিল। গভীর রাতে তিনি এলাকায় ফিরেছেন জানতে পেরে ক্ষুব্ধ জনতা এ ঘটনা ঘটিয়ে থাকতে পারে।
বাঙ্গরা বাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শফিউল আলম জানান, নিহত আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে পূর্বে দায়ের হওয়া বিভিন্ন ঘটনার অন্তত ৬টি মামলা রয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, রাজনৈতিক ও স্থানীয় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের পূর্ববিরোধের জেরেই এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। পুরো বিষয়টি নিবিড়ভাবে তদন্ত করা হচ্ছে এবং জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে অভিযান চলছে।
এস এম সোহাগ ফরাজী