সুনামগঞ্জে ছাত্রলীগ নেতা প্রিন্সকে গ্রেপ্তারের পর পুলিশ হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগ: আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে, অস্বীকার ওসির
স্টাফ রিপোর্টার (শাহ তোফাজ্জুল হোসেন ভান্ডারী):
সুনামগঞ্জে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের এক নেতাকে বাসা থেকে গ্রেপ্তারের পর পুলিশ হেফাজতে অমানবিক শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। গুরুতর অসুস্থ ও সংজ্ঞাহীন অবস্থায় শাহনেওয়াজ চৌধুরী প্রিন্স (১৯) নামের ওই তরুণকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিলেটের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তবে পুলিশ হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে সংশ্লিষ্ট থানা কর্তৃপক্ষ।
ভুক্তভোগী শাহনেওয়াজ চৌধুরী প্রিন্স সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে পরিচিত। তিনি শহরের তেঘরিয়া গ্রামের বাসিন্দা শাহরুখ রাজা চৌধুরীর ছেলে। বর্তমানে পরিবারটি শহরের নতুনপাড়া আবাসিক এলাকায় বসবাস করছে। তিনি এ বছর সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছেন।
গতকাল বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর ২০২৬) দিবাগত রাত আনুমানিক ১২টার দিকে তাঁকে নতুনপাড়ার বাসা থেকে গ্রেপ্তার করে সুনামগঞ্জ সদর মডেল থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রতন শেখ।
উদ্বেগজনক বিষয় হলো, যেদিন সিলেটে বহুল আলোচিত বন্দরবাজার ফাঁড়িতে পুলিশি নির্যাতনে নিহত রায়হান আহমদ হত্যা মামলার ঐতিহাসিক রায়ে আদালত সুস্পষ্ট পর্যবেক্ষণে জানিয়েছিলেন—‘আটক অবস্থায় কোনো ব্যক্তিকে শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন করার অধিকার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নেই, কোনো ব্যক্তি দুর্ধর্ষ অপরাধী হলেও বিচার ছাড়া তাঁকে শাস্তি দেওয়ার অধিকার কারও নেই’—ঠিক সেই রাতেই সুনামগঞ্জে এমন মারাত্মক অভিযোগ সামনে এলো।
পরিবারের গুরুতর অভিযোগ ও ভাইরাল ভিডিও:
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওচিত্রে দেখা যায়, গ্রেপ্তারের সময় প্রিন্স দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তাকে বলছিলেন, “স্যার আমি কয়দিন পর আদালতে আত্মসমর্পণ করব।” জবাবে পুলিশ সদস্যকে বলতে শোনা যায়, “বোকা ছেলের মতো কথা বলো।”
প্রিন্সের বাবা শাহরুখ রাজা চৌধুরী অভিযোগ করে জানান, বৃহস্পতিবার রাত আনুমানিক সাড়ে ১১টার দিকে সদর থানার এসআই জাকারিয়ার নেতৃত্বে একদল পুলিশ তাঁদের বাসায় যায়। ওসির সঙ্গে একটু দেখা করানোর কথা বলে প্রিন্সকে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু রাত দেড়টার দিকে তিনি লোকমুখে খবর পান যে তাঁর ছেলে জ্ঞান হারিয়ে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে পড়ে আছে।
তিনি আরও জানান, সদর হাসপাতাল থেকে মুমূর্ষু অবস্থায় প্রিন্সকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা না পেয়ে শেষ পর্যন্ত নগরীর সুবিদবাজার এলাকার কুইন্স প্রাইভেট হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। প্রিন্স বর্তমানে সেখানে সংজ্ঞাহীন ও আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
ছেলের রাজনৈতিক পরিচয় নাকচ করে শাহরুখ রাজা চৌধুরী দাবি করেন, “আমার ছেলে সক্রিয় রাজনীতির সাথে জড়িত নয়। সে এ বছর বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। পূর্বে রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগার থেকেই পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল। বর্তমানে সব মামলায় জামিনে থাকা সত্ত্বেও বাসা থেকে ধরে নিয়ে যাওয়ার মাত্র দুই ঘণ্টার মাথায় তাকে পিটিয়ে রক্তাক্ত ও নিস্তেজ করে হাসপাতালে ফেলে রাখা হলো।”
অভিযোগ অস্বীকার করে পুলিশের বক্তব্য:
হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করে সুনামগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রতন শেখ বলেন, “শাহনেওয়াজ চৌধুরী প্রিন্সের বিরুদ্ধে থানায় সুনির্দিষ্ট তিনটি মামলা রয়েছে। সে আগে থেকেই শারীরিকভাবে দুর্বল এবং তার পুরনো মৃগীরোগ বা খিঁচুনি রোগ রয়েছে।”
ওসি আরও দাবি করেন, “রাতে থানায় নেওয়ার পর সে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে কালবিলম্ব না করে তাৎক্ষণিকভাবে সদর হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নেওয়া হয়। সেখান থেকে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাকে ওসমানী হাসপাতালে রেফার করেন। তবে তার পরিবার ওসমানী হাসপাতাল থেকে স্থানান্তর করে একটি বেসরকারি ক্লিনিকে নিয়ে গেছে। সে বর্তমানে পুলিশের সার্বক্ষণিক নজরদারি ও তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন রয়েছে। থানায় তার ওপর কোনো প্রকার শারীরিক নির্যাতন করা হয়নি।”
এস এম সোহাগ ফরাজী