সিলেটে ট্রিপল মার্ডার মামলায় নতুন মোড়: এজাহারে নেই ধৃত বাবুলের নাম, ভূমি বিরোধে অভিযোগের তীর অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলামের দিকে
সিলেট প্রতিনিধি: শাহ্ তোফাজ্জল হোসেন ভানডারী।
সিলেট নগরীর রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকায় আলোচিত ট্রিপল মার্ডারের ঘটনায় কোতোয়ালী মডেল থানায় আনুষ্ঠানিকভাবে মামলা দায়ের করা হয়েছে। তবে পুলিশের হাতে রক্তমাখা ছুরিসহ গ্রেফতার হওয়া বাবুল মিয়ার নাম বাদীর এজাহারে উল্লেখ করা হয়নি। দীর্ঘদিনের ভূমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে ভাড়াটে পেশাদার খুনি দিয়ে এ নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে দাবি করে অভিযোগের তীর তোলা হয়েছে ইম্পালস বিল্ডার্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলামের দিকে।
শুক্রবার (১৪ আগস্ট ২০২৬) নিহত আব্দুস সাত্তারের যুক্তরাজ্য প্রবাসী মেয়ে সেলিনা সুলতানা (৫৪) বাদী হয়ে কোতোয়ালী মডেল থানায় এ অভিযোগ দাখিল করেন।
৮৪ শতক ভূমি বিরোধ ও মামলার ইতিহাস
এজাহারে বাদী উল্লেখ করেন, ১৯৬৭ সাল থেকে সিলেট রিকাবীবাজারের সরণপুর এলাকায় পুলিশ লাইন লুসাই গির্জা সমিতি থেকে লিজ নেওয়া ১২ শতক জমিতে তাঁদের ভোগদখল ছিল। পরবর্তীতে ২০০৬ সালে ইম্পালস বিল্ডার্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম ওই লিজকৃত ভূমিসহ গির্জা সমিতির মোট ৮০ শতক ভূমির ভুয়া দলিল তৈরি করে মালিকানা দাবি করেন। এ নিয়ে আদালতে একাধিক স্বত্ব মামলা ও দেওয়ানি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
বাদীপক্ষের দাবি, মামলা প্রত্যাহার করার জন্য অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে নিহত এম এ সাত্তার ও তাঁর পরিবারকে নানাভাবে হুমকি-ধমকি দিয়ে আসছিলেন। এ সংক্রান্ত একাধিক সাধারণ ডায়েরি (জিডি) এবং সিআর মামলা দায়ের করা হয়েছিল, যা বর্তমানে সিলেট ডিবিতে তদন্তাধীন।
দলিল আত্মসাৎ ও ভাড়াটে খুনির অভিযোগ
এজাহারে আরও অভিযোগ করা হয়, ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ ও বিচারাধীন মামলাগুলো থেকে নিজেদের রক্ষা করার উদ্দেশ্যে পূর্বপরিকল্পিতভাবে অজ্ঞাত ভাড়াটে খুনিদের মাধ্যমে গত ১২ আগস্ট সকাল আনুমানিক ৯টায় রায়নগরের বাসায় এম এ সাত্তার, তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম এবং গৃহকর্মী তাহমিনা বেগমকে হত্যা করা হয়। হত্যাকাণ্ডের পর বাসা থেকে ভূমি ও মামলা সংক্রান্ত যাবতীয় মূল কাগজপত্র, জিডির কপি ও গুরুত্বপূর্ণ দলিলাদি লুট করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়।
বাদীর দায়ের করা এজাহারটি হুবহু তুলে ধরা হলো:
বরাবর
অফিসার ইনচার্জ
কোতোয়ালী মডেল থানা
এসএমপি, সিলেট।
বিষয়: অভিযোগ
জনাব,
সবিনয় বিনীত নিবেদন এই যে আমি নিম্ন স্বাক্ষরকারী সেলিনা সুলতানা (৫৪), পিতা-মৃত এম এ সাত্তার, মাতা-মৃত সুরাইয়া বেগম, সাং-বাসা নং-মিতালী-১১১ রায়নগর, রাজবাড়ী, থানা-কোতোয়ালী, জেলা-সিলেট, এনআইডি নং- ৩৩১৪৬১০৬১৩, জন্ম তারিখ-১৯/১১/১৯৭২ইং অদ্য ১৪/০৮/২০২৬ইং অত্র থানায় উপস্থিত হয়ে এই মর্মে অভিযোগ দায়ের করিতেছি যে, আমি যুক্তরাজ্য প্রবাসী, গত ১৩/০৮/২০২৬ইং তারিখে যুক্তরাজ্য থেকে বাংলাদেশে আসি। ১৯৬৭ সালে আমি এবং আমার পিতা যৌথভাবে পুলিশ লাইন লুসাই গির্জা সমিতি সিলেট এর নিকট থেকে রিকাবী বাজারের সরণপুর এলাকায় আনুমানিক ১২ শতক ভূমি লিজ নিয়ে সেথায় গৃহ নির্মাণ করে ভোগ দখলে থাকা অবস্থায় ২০০৬ সালে ইম্পালস বিল্ডার্স লিমিটেড এর চেয়ারম্যান এ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম আমার এবং আমার পিতার লিজকৃত ভূঁমি সহ পুলিশ লাইন লুসাই গির্জা সমিতি সিলেট এর ৮০ শতক ভূঁমি ইম্পালস বিল্ডার্স লিমিটেড এর নামে ১৮৫২২/০৬নং সাফকবলা দলিল সৃষ্টি করে তদ্ অনুকূলে নামজারী করে মালিকানা দাবী করে আমাদেরকে উচ্ছেদের হুমকি দিলে আমার পিতা ২০১৬ সালে তাহার বিরুদ্ধে স্বত্ব ৬০/২০১৬নং মামলা দায়ের করলে এ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম সহ অজ্ঞাত ব্যক্তিরা আমার পিতাকে প্রাণ নাশের হুমকি দিলে আমার পিতা তাহার বিরুদ্ধে একটি সাধারণ ডায়রী করেন এবং উক্ত স্বত্ব মোকদ্দমাটি স্বত্ব- ২১১/২০২৩ নং নম্বরভুক্ত হয়ে মাননীয় যুগ্ম জেলা জজ অতিরিক্ত আদালতে বিচারাধীন আছে।
এ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম বিভিন্ন সময়ে আমাকে এবং আমার পিতাকে উক্ত মামলাটি প্রত্যাহারের জন্যে অব্যাহত ভাবে বারবার হুমকি দিতে থাকে। সর্বশেষ সিরাজুল ইসলাম আমার পিতাকে হয়রানি করার জন্যে আমার পিতা, জনৈক মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম, পুলিশ লাইন লুসাই গির্জা সমিতি সিলেট এর বর্তমান চেয়ারম্যান জনাব জমিথাংগা লুসাই এবং আরো অন্যান্য লীজ গ্রহীতাদের বিরুদ্ধে ঢাকা ৫/১৭নং মামলা দায়ের করেন যাহা মাননীয় অতিরিক্ত জেলা জজ ৫ম আদালতে ঢাকা ৩/২০২৩ নম্বরভুক্ত হয়ে বিচারাধীন আছে। আগামী ১৯/০৮/২০২৬ইং তারিখে মাননীয় অতিরিক্ত জেলা জজ ৫ম আদালতে এ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম কর্তৃক দায়েরকৃত উক্ত স্বত্ব-২১১/২০২৩নং মামলা থেকে উদ্ভূত ৭০/২০২৩নং সিভিল রিভিশন মোকদ্দমার ধার্য তারিখ।
এমতাবস্থায় বিগত ২৯/০১/২০২৫ইং তারিখে আনুমানিক বিকাল ৫.০০ ঘটিকায় এ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম আমিন হোসেন সহ আরো অজ্ঞাত ব্যাক্তিদের নিয়ে আমার পিত্রালয়ে আসে স্বত্ব মামলাটি প্রত্যাহারের জন্যে হুমকি দিলে আমি এবং আমার পিতা উক্ত মামলাটি প্রত্যাহারে অস্বীকৃতি জানালে উভয় পক্ষের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক হয় এবং এ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম মামলা সহ আমাদেরকে দেখে নেয়ার হুমকি দিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করলে আমি উক্ত বিষয়ে অত্র থানায় একটি সাধারণ ডায়রী করি। কিন্তু যুক্তরাজ্যে ফিরে যাওয়ার কারণে উক্ত সাধারণ ডায়রী বিষয়ে কোন পদক্ষেপ গ্রহন করা সম্ভব হয় নাই। এর পরে বিগত ১৮/০৫/২০২৫ইং তারিখে আমার পিতা এবং জনাব মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম এ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলামের দায়েরকৃত ঢাকা ০৩/২০২৩ নং মামলা পরিচালনা করার জন্যে সিলেট জেলা জজ কোর্টে উপস্থিত হলে দুপুর ১২.৫৫ ঘটিকায় সিলেট জেলা ও দায়রা জজ আদালত ভবনের সামনে এ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম পুলিশ লাইন লুসাই গির্জা সমিতির ভূঁমির মালিকানা দাবী করিয়া আমার পিতা এম, এ সাত্তারকে তাহার কোম্পানির বিরুদ্ধে দায়েরকৃত স্বত্ব ২১১/২০২৩ নং মামলা তুলে নেয়ার জন্যে হুমকি দেয়। আমার পিতা এম এ সাত্তার এবং জনাব মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম সিরাজুল ইসলামের দাবী প্রত্যাখ্যান করলে সিরাজুল ইসলাম হঠাৎ করে মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলামকে প্রাণে হত্যার উদ্দেশ্যে স্বজোরে মাথার পিছনে কিল ঘুসি মারতে মারতে রক্তাক্ত জখম করে মাটিতে ফেলে দিলে আমার পিতা বাধা দিলে তাহাকেও আঘাত করা হয়। উক্ত বিষয়ে মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম অত্র থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করেন কিন্তু উক্ত অভিযোগে কোন প্রতিকার না পাওয়ায় বিগত ০৬/০৮/২০২৫ইং তারিখে বিজ্ঞ ১ম আদালতে কোতোয়ালী সিআর ১০৫৭/২০২৫নং মামলা দায়ের করেন এবং উক্ত মামলাটি ডিবি সিলেটে তদন্তাধীন আছে এবং আমার পিতা আমার পক্ষে আমমোক্তার বাদী হয়ে সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন ২০২৩ এ কোতোয়ালী সিআর ৮১৫/২০২৪ নং মামলা দায়ের করেন এবং নিজের জন্যে কোতোয়ালী সিআর ১৩৬৪/২০২৩ নং মামলা দায়ের করেন এবং মামলাগুলো ডিবি সিলেট এ তদন্তাধীন আছে।
সর্বশেষ বিগত ২৮/০৭/২০২৬ইং তারিখে যুগ্ম জেলা জজ ২য় আদালতে পুলিশ লাইন লুসাই গির্জা সমিতির ভূমি সংক্রান্ত স্বত্ব ৭৩/২৩নং মোকদ্দমার শুনানী চলাকালীন সময়ে আমার পিতার নিয়োজিত আইনজীবীকে প্রকাশ্যে হুমকি প্রদান করেন এবং ৩০/০৭/২০২৬ইং তারিখে আমার পিতা এম, এ সাত্তার, এ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলামের দায়েরকৃত ঢাকা ৩/২০২৩নং মামলা শুনানীর জন্যে জজ কোর্টে উপস্থিত হলে সিরাজুল ইসলাম আমার পিতাকে আবারোও মামলা প্রত্যাহারের জন্যে হুমকি প্রদান করেন।
আমার পিতার স্বত্ব মামলা থেকে ১৮৫২২/০৬ সাফকবলা দলিলটি রক্ষা করার জন্যেই পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী অত্যন্ত পেশাদার অজ্ঞাত ভাড়াটিয়া খুনীদের মাধ্যমে বিগত ১২/০৮/২০২৬ ইং তারিখে আনুমানিক সকাল ৯.০০ ঘটিকায় কোতোয়ালী মডেল থানাধীন রায়নগরের মিতালী আবাসিক এলাকার ১১১নং বাসার ২য় তলায় নিজ বাস ভবনে আমার বৃদ্ধ পিতা এম এ সাত্তার, মাতা সুরাইয়া বেগম এবং গৃহকর্মী তাহমিনা বেগমকে হত্যা করে বাসা থেকে মামলা ও ভূমি সংক্রান্ত সকল কাগজপত্র, জিডি কপি এবং দলিলাদি নিয়ে যায়। আমি যুক্তরাজ্য হতে বাংলাদেশে আসিয়া আমার পিতা-মাতার দাফন-কাফন কার্যক্রম শেষে আমার আত্মীয়-স্বজনদের সাথে আলাপ-আলোচনা করে অভিযোগ দায়ের করতে বিলম্ব হলো।
অতএব, আপনার নিকট আকুল আবেদন এই যে উপরোক্ত অবস্থা বিবেচনায় এবং ন্যায় ও সুবিচারের স্বার্থে বিগত ১২/০৮/২০২৬ইং তারিখে কোতোয়ালী মডেল থানাধীন রায়নগরের মিতালী আবাসিক এলাকার ১১১ নং বাসায় সংঘটিত অপরাধের সাথে জড়িত প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ সকল অপরাধীদের সনাক্ত করে তাহাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং আমার বাসা হতে খোয়া যাওয়া কাগজপত্র এবং দলিলাদি উদ্ধারের জন্যে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে আপনার মর্জি হয়।
বিনীত
সেলিনা সুলতানা (স্বাক্ষরিত)