লাইসেন্স ছাড়াই চলত চিকিৎসাসেবা: সিলেটে ‘ডিএমটি সেফওয়ে হাসপাতাল’ সিলগালা, মূল ফটকে নোটিশ ঝুলাল ভ্রাম্যমাণ আদালত
সিলেট প্রতিনিধি, শাহ তোফাজ্জুল হোসেন ভান্ডারী | দৈনিক জীবনযাত্রা:
কোনো প্রকার বৈধ লাইসেন্স ও সরকারি অনুমোদন ছাড়াই অবৈধভাবে চিকিৎসাসেবা ও প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম পরিচালনা করার দায়ে সিলেট নগরীর মির্জাজাঙ্গাল এলাকার বহুল আলোচিত ‘ডিএমটি সেফওয়ে হাসপাতাল’ সম্পূর্ণভাবে সিলগালা করে দিয়েছে জেলা প্রশাসন।
গতকাল সোমবার (২০ জুলাই ২০২৬) সিলেট জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের উদ্যোগে পরিচালিত এক বিশেষ ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে হাসপাতালটির কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করে মূল ফটকে নোটিশ ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সিহাব বিন আমিনের প্রত্যেক্ষ নেতৃত্বে এই অভিযান পরিচালিত হয়।
২৪ ঘণ্টার সময়সীমা পেরোলেও মেলেনি বৈধ লাইসেন্স
অভিযান সংশ্লিষ্ট সূত্র ও জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরেই কোনো অনুমোদিত সরকারি নথিপত্র ছাড়া সাধারণ মানুষকে চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছিল। এর ধারাবাহিকতায় গত রবিবার (১৯ জুলাই) হাসপাতালটিতে প্রথম দফায় এক প্রারম্ভিক অভিযান চালায় জেলা প্রশাসনের আভিযানিক দল। অভিযান পরিচালনাকালে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে তাঁদের কার্যক্রম চালনার অনুকূলে বৈধ লাইসেন্স ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র প্রদর্শনের নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে সে সময় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কোনো বৈধ কাগজপত্র বা লাইসেন্স দেখাতে ব্যর্থ হয়।
পরিস্থিতি বিবেচনা করে ভ্রাম্যমাণ আদালত হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে স্বাচ্ছন্দ্যে লাইসেন্স প্রদর্শনের জন্য ২৪ ঘণ্টার একটি আল্টিমেটাম ও নমনীয় সময়সীমা বেঁধে দেয়। আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কথা ছিল, সোমবারের মধ্যে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার দপ্তরে তাঁদের হালনাগাদ ও বৈধ লাইসেন্সের কপি জমা দেবেন। তবে নির্ধারিত ২৪ ঘণ্টার সময়সীমা পার হয়ে গেলেও সোমবার পর্যন্ত হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কোনো বৈধ লাইসেন্স বা সরকারি অনুমোদনের প্রমাণপত্র জমা দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়।
লাইসেন্স প্রদানে ব্যর্থতার পর সোমবার জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সিহাব বিন আমিনের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত পুনরায় সেখানে উপস্থিত হন। পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানের প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে সিলগালা করা হয় এবং একটি অফিসিয়াল বন্ধের নোটিশ টানিয়ে দেওয়া হয়।
পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত হাসপাতাল বন্ধ
অভিযান শেষে উপস্থিত সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সিহাব বিন আমিন বলেন,
“অভিযান পরিচালনাকালে আমরা দেখতে পাই যে, স্বাস্থ্য দপ্তরের কোনো বৈধ লাইসেন্স বা অনুমোদন ছাড়াই প্রতিষ্ঠানটি সম্পূর্ণ অবৈধ উপায়ে তাদের হাসপাতাল পরিচালনা করে আসছিল। প্রথম দিন সুযোগ দেওয়ার পরও তারা লাইসেন্স দেখাতে পারেনি। ফলে আজ আইনানুগ প্রক্রিয়ায় এটি সিলগালা করা হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশ বা নোটিশ না দেওয়া পর্যন্ত হাসপাতালটি সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে এবং এই সময়ের মধ্যে হাসপাতালে কোনো ধরনের রোগী ভর্তি, চিকিৎসা সেবা বা বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে না।”
ভুল চিকিৎসা ও মৃত্যুর পুরনো অভিযোগ
স্থানীয় সচেতন মহল ও ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, অবৈধভাবে পরিচালিত এই হাসপাতালটির বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ বহু পুরোনো। অতীতে ভুল চিকিৎসার কারণে রোগীর মৃত্যুর মতো স্পর্শকাতর ও গুরুতর ঘটনাও এই হাসপাতালে ঘটেছে বলে জানা যায়।
পূর্বে সংঘটিত অনিয়মের ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের গত জানুয়ারি মাসেও জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত এই ডিএমটি সেফওয়ে হাসপাতালে একটি অভিযান পরিচালনা করেছিল। সে সময় বিভিন্ন প্রশাসনিক ত্রুটি ও অব্যবস্থাপনার দায়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। জরিমানা ও বারবার আইনি স সতর্কবার্তা দেওয়ার পরও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সরকারি নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করে এবং বৈধ লাইসেন্স না নিয়েই অবৈধভাবে রোগীদের জীবন নিয়ে ব্যবসা চালিয়ে আসছিল। অবশেষে জেলা প্রশাসনের এই কঠোর পদক্ষেপে অনুমোদনহীন হাসপাতালটির অবসান ঘটল।
এস এম সোহাগ ফরাজী।