সুন্দরী লো হুনিলা আমার কথা মানিলা’ গানের মালিকানা বিরোধের অবসান, বাউল জুয়েল আহমদকেই প্রকৃত মালিক ঘোষণা
সিলেট প্রতিনিধি | শাহ তোফাজ্জুল হোসেন ভান্ডারী
সিলেটের জনপ্রিয় আঞ্চলিক গান ‘সুন্দরী লো হুনিলা আমার কথা মানিলা’-এর মালিকানা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলা বিরোধের অবসান হয়েছে। স্থানীয়ভাবে আয়োজিত এক সালিশ বৈঠকে সাক্ষ্য-প্রমাণ, জবানবন্দি ও সংশ্লিষ্ট তথ্য পর্যালোচনা শেষে গানের প্রকৃত রচয়িতা ও মালিক হিসেবে বাউল জুয়েল আহমদকে ঘোষণা করা হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) বিকেল ৫টায় বিশ্বনাথ উপজেলার ৫ নম্বর দৌলতপুর ইউনিয়নের সিংগেরকাছ চৌধুরী বাজারস্থ সিতারা কমিউনিটি সেন্টারে এ সালিশ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। লেনকাটা নওয়াগাঁও গ্রামের তরুণ সমাজসেবক মো. ফাহিম আহমদের উদ্যোগে আয়োজিত এ বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন দৌলতপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও বিশিষ্ট সালিশ ব্যক্তিত্ব আবারক আলী চেয়ারম্যান।
সালিশ বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন দৌলতপুর ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান হাফিজ আরব খান, সিলেট জজ কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম, জাতীয়তাবাদী বাউল দল সিলেট জেলা শাখার সভাপতি মুক্তার আহমদ বকুল, বাউল শিল্পী কল্যাণ ট্রাস্ট সিলেটের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান শাহ তোফাজ্জুল ভান্ডারী, সিলেট ডাইরেক্ট পেইজের স্বত্বাধিকারী সাংবাদিক তৌফিকুর রহমান হাবিব, ইউপি সদস্য নুর উদ্দিন, গীতিকার এইচ. এম. আরশ আলী, বিশিষ্ট মুরব্বি আবুল কালাম, বাউল আনছার আলী, বাউল সফিক উদ্দিন, বাউল সালেহ আহমদ, সংগীতপ্রেমী সোহেল আহমদ, শাহীন আহমদ, সাদ্দাম হোসেন জুনেদসহ বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। এছাড়া বিশ্বনাথ উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রায় দুই শতাধিক গণ্যমান্য ব্যক্তি বৈঠকে অংশগ্রহণ করেন।
বৈঠকের আলোচ্য বিষয় ছিল জনপ্রিয় আঞ্চলিক গান ‘সুন্দরী লো হুনিলা আমার কথা মানিলা’-এর মালিকানা নিয়ে সৃষ্ট বিরোধের নিষ্পত্তি। গানটি জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ইত্যাদিতে প্রচারিত হওয়ার পর কবি খালেদ মিয়া এর রচয়িতা হিসেবে দাবি করেন। এরপর বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুই পক্ষের সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা, সমালোচনা ও বিতর্ক শুরু হয়। এতে সংগীতাঙ্গনসহ সামাজিক ও রাজনৈতিক মহলেও নানা প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়।
বিরোধ নিরসনে একাধিকবার আপস-মীমাংসার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা সফল হয়নি। পরবর্তীতে ফাহিম আহমদের উদ্যোগে উভয় পক্ষকে নিয়ে আনুষ্ঠানিক সালিশ বৈঠকের আয়োজন করা হয়।
সালিশে কবি খালেদ মিয়া দাবি করেন, তিনি ১৯৮৭ সালে গানটি রচনা করেছেন। তবে তিনি তার দাবির পক্ষে গ্রহণযোগ্য কোনো লিখিত নথি, প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য বা অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি।
অন্যদিকে, বাউল জুয়েল আহমদ দাবি করেন, তিনি ১৯৮৫ সালে গানটি রচনা করেন এবং ১৯৯৭-৯৮ সালে একটি সংগীতানুষ্ঠানে কবি খালেদ মিয়ার উপস্থিতিতেই নিজের নামে গানটি পরিবেশন করেছিলেন। তিনি এ দাবির সমর্থনে প্রত্যক্ষ সাক্ষী, বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ এবং আরও বেশ কিছু নথি সালিশ বোর্ডের সামনে উপস্থাপন করেন।
এরপর উপস্থিত গণ্যমান্য ব্যক্তিদের মতামতের ভিত্তিতে ১০ সদস্যের একটি সালিশ বোর্ড গঠন করা হয়। বোর্ডে বাউল জুয়েল আহমদের পক্ষে সালিশ ব্যক্তিত্ব শাহ তোফাজ্জুল ভান্ডারী এবং কবি খালেদ মিয়ার পক্ষে আবুল কালাম বক্তব্য উপস্থাপন করেন। এছাড়া বোর্ডে চেয়ারম্যান হাফিজ আরব খান, ইউপি সদস্য নুর উদ্দিন, অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম, গীতিকার এইচ. এম. আরশ আলী, মো. ফাহিম আহমদ, মুক্তার আহমদ বকুল, তৌফিকুর রহমান হাবিবসহ অন্যান্য সদস্য দায়িত্ব পালন করেন।
সালিশ বোর্ড উভয় পক্ষের জবানবন্দি, জেরা, সাক্ষ্য ও উপস্থাপিত প্রমাণ বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করে সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে, ‘সুন্দরী লো হুনিলা আমার কথা মানিলা’ গানের প্রকৃত রচয়িতা ও মালিক বাউল জুয়েল আহমদ।
রায় ঘোষণার পর দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ সময় কবি খালেদ মিয়ার ছেলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে করা কিছু আপত্তিকর মন্তব্যের জন্য প্রবীণ বাউল শিল্পী ও গীতিকার জুয়েল আহমদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেন। পরে কবি খালেদ মিয়া ও বাউল জুয়েল আহমদের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে মিলমিশ করিয়ে দেওয়া হয়।
সবশেষে সালিশ বৈঠকের সভাপতি আবারক আলী চেয়ারম্যান উপস্থিত সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বৈঠকের সমাপ্তি ঘোষণা করেন। দীর্ঘদিনের এ বিরোধের শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তিকে স্থানীয় সাংস্কৃতিক অঙ্গনের জন্য একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন উপস্থিত বিশিষ্টজনেরা।
দৈনিক জীবন যাএা
এস এম সোহাগ ফরাজী