হবিগঞ্জে আইফোনের জন্য ঘুমন্ত বন্ধুকে কুপিয়ে হত্যা: ৬ দিন পর ডোবা থেকে গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার, ঘাতক আট
স্টাফ রিপোর্টার (শাহ তোফাজ্জুল হোসেন ভান্ডারী):
মাত্র একটি আইফোনের লোভে বাল্যবন্ধুত্বকে বিসর্জন দিয়ে ঘুমন্ত বন্ধুকে দা দিয়ে কুপিয়ে ও গলাকেটে নির্মমভাবে হত্যা করেছে সহকর্মী বন্ধু। নিখোঁজের দীর্ঘ ছয় দিন পর হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার ফুলবাড়িয়া গ্রামের একটি ডোবা থেকে তারেক মিয়া (২২) নামের ওই নির্মাণ শ্রমিকের গলাকাটা ও অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ।
গতকাল মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর ২০২৬) দিবাগত রাত ৮টার দিকে আটক বন্ধু সাহেল মিয়ার স্বীকারোক্তি ও দেখানো তথ্যের ভিত্তিতে মরদেহটি উদ্ধার করা হয়।
নিহত তারেক মিয়া নবীগঞ্জ উপজেলার সদর ইউনিয়নের চৌশতপুর গ্রামের মারফত উল্লাহর (মহব্বত উল্লাহ) ছেলে। ঘাতক বন্ধু সাহেল মিয়া (২১) একই গ্রামের নুরুজ্জামান মিয়ার ছেলে।
বাল্যবন্ধুত্ব থেকে ভবনের নির্মাণ কাজ:
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, চৌশতপুর গ্রামের তারেক ও সাহেল শৈশব থেকেই ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। সম্প্রতি তাঁরা দুজন লাখাই উপজেলার ফুলবাড়িয়া গ্রামে একটি বহুতল ভবনের নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে একসঙ্গে কাজে যোগ দেন।
গত ২১ অক্টোবর দুপুরে বাড়ি থেকে কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে বের হয়ে হঠাৎ নিখোঁজ হন তারেক। দীর্ঘ সময় ছেলের কোনো সন্ধান না পেয়ে পরিবারের সদস্যরা সাহেলের বাড়িসহ সম্ভাব্য সব স্থানে খোঁজাখুঁজি করেন। সন্ধান না মেলায় গত ২৫ অক্টোবর তারেকের বাবা বাদী হয়ে নবীগঞ্জ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।
গ্রামবাসীর হাতে আটক ও লোমহর্ষক স্বীকারোক্তি:
তারেক নিখোঁজ হওয়ার পর থেকেই বন্ধু সাহেলের অসংলগ্ন কথাবার্তা ও গতিবিধিতে পরিবার ও স্থানীয় প্রতিবেশীদের মনে গভীর সন্দেহের জন্ম হয়। মঙ্গলবার বিকেলে সাহেল নিজ গ্রামে ফিরে এলে গ্রামবাসী তাঁকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে আটক করেন। পরে নবীগঞ্জ থানায় খবর দেওয়া হলে পুলিশ এসে তাঁকে নিজেদের হেফাজতে নেয়।
পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ভেঙে পড়ে বন্ধুকে হত্যার রোমহর্ষক বর্ণনা দেন সাহেল। তিনি স্বীকার করেন, তারেকের ব্যবহৃত দামি আইফোনটি আত্মসাৎ করার তীব্র লোভ থেকেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন।
স্বীকারোক্তিতে সাহেল জানান, গত ২২ অক্টোবর গভীর রাতে কর্মস্থলে যখন তারেক গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলেন, তখন ধারালো দা দিয়ে তাঁর গলায় ও শরীরে উপর্যুপরি কুপিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করেন তিনি। এরপর রাতারাতি রক্তমাখা মরদেহটি ফুলবাড়িয়া গ্রামের একটি নির্জন ডোবার ভেতর কচুরিপানার নিচে লুকিয়ে রাখেন। হত্যাকাণ্ডের পরপরই তারেকের ব্যবহৃত আনুমানিক ৫০ হাজার টাকা মূল্যের আইফোনটি মাত্র ১৫ হাজার টাকায় বিক্রি করে আত্মগোপনে চলে যান তিনি।
পরবর্তীতে নবীগঞ্জ ও লাখাই থানা পুলিশের যৌথ টিম সাহেলকে সঙ্গে নিয়ে ফুলবাড়িয়া গ্রামের সেই ডোবায় অভিযান চালায় এবং রাত ৮টার দিকে তারেকের গলিত মরদেহ উদ্ধার করে।
পুলিশ প্রশাসনের বক্তব্য:
লাখাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শরীফ আহমেদ জানান, “আটক সাহেলের সরাসরি স্বীকারোক্তি ও শনাক্তকরণের ভিত্তিতে লাখাই উপজেলার ফুলবাড়িয়া এলাকার ডোবা থেকে যুবকের মরদেহটি উদ্ধার করা হয়েছে।”
নবীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আবুল হোসেন বলেন, “আইফোন আত্মসাতের উদ্দেশ্যেই ঘুমন্ত বন্ধুকে দা দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করার কথা সাহেল পুলিশের কাছে স্পষ্ট স্বীকার করেছে। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য হবিগঞ্জ ২৫০ শয্যা আধুনিক জেলা সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে হত্যা মামলা দায়েরের আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।”
আইফোন ছিনতাই ঘিরে সাম্প্রতিক পুনরাবৃত্তি:
উল্লেখ্য, দামি আইফোন ছিনিয়ে নিতে তরুণদের ওপর এমন বর্বর হত্যাকাণ্ডের ঘটনা সম্প্রতি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত ১৯ সেপ্টেম্বর কুমিল্লার লালমাই পাহাড়ের নির্জন স্থান থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের সন্তান তরুণ শিক্ষার্থী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের মরদেহ। সেখানেও পুলিশি তদন্তে বেরিয়ে এসেছিল, কেবল আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যেই পরিকল্পিতভাবে নির্জন পাহাড়ে নিয়ে তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল তিন ঘাতক। হবিগঞ্জের এই মর্মান্তিক ঘটনাটি সেই নৃশংস স্মৃতিকেই আবারও সামনে নিয়ে এলো।
এস এম সোহাগ ফরাজী