সাঈদীর মামলার প্রধান বাদী বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর দাফনে বাধা: মধ্যরাতে মোবাইলের আলো জ্বালিয়ে কবর খুঁড়লেন মেয়ে ও বোনেরা
পিরোজপুর প্রতিনিধি:
একাত্তরের রণাঙ্গনে লাল-সবুজের পতাকার জন্য যিনি নিজের জীবন বাজি রেখে অস্ত্র হাতে লড়াই করেছিলেন, মৃত্যুর পর সেই বীর মুক্তিযোদ্ধাকেই শেষবিদায়ের ক্ষণে সইতে হলো চরম অবমাননা ও বাধা। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে পিরোজপুরে দায়ের করা মামলার অন্যতম প্রধান বাদী ও গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারী। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর জানাজা ও শেষকৃত্যে বাধার মুখে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়েছে।
চরম প্রতিকূল ও বৈরী পরিবেশের মুখে বাধ্য হয়ে মধ্যরাতে কোনো সাহায্য ছাড়াই কেবল মুঠোফোনের আলো জ্বালিয়ে এই বীর সন্তানের কবর খুঁড়েছেন তাঁর নিজের কন্যা ও দুই বোন।
বাধা ও অবমাননার হৃদয়বিদারক চিত্র:
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর মৃত্যুর পর তাঁর জানাজা ও দাফনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্নের উদ্যোগ নেওয়া হলে স্থানীয় জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মী ও তাদের অনুসারীরা তাতে প্রকাশ্যে বাধা প্রদান করেন। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে আদালতে অকাট্য সাক্ষ্য ও মামলা দায়েরের জের ধরে দীর্ঘদিন ধরেই মানিক পশারী ও তাঁর পরিবারের ওপর আক্রোশ ছিল বলে অভিযোগ ওঠে।
তাঁর চিরবিদায়ের মুহূর্তেও সেই রাজনৈতিক বৈরিতা নির্মম রূপ ধারণ করে। জানাজা ও দাফনে তৈরি হওয়া অচলাবস্থার কারণে কোনো গ্রামবাসীও সহযোগিতার জন্য এগিয়ে আসতে সাহস পাননি। ফলে এক অমানবিক ও গা শিউরে ওঠার মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
মোবাইলের আলোয় স্বজনদের কবর খনন:
চারপাশে চরম ভয় ও বৈরী আবহের কারণে শেষ পর্যন্ত আর কারও ওপর ভরসা রাখতে পারেননি শোকস্তব্ধ স্বজনরা। মৃত বীর মুক্তিযোদ্ধার শেষ ঠিকানা নিশ্চিত করতে মধ্যরাতের অন্ধকারে মোবাইলের টর্চের আলো জ্বালিয়ে নিজ হাতে কোদাল তুলে নেন মানিক পশারীর একমাত্র মেয়ে এবং তাঁর দুই বোন। নারীদের হাতে পরম ভালোবাসায় ও ক্ষোভে খুঁড়া সেই কবরেই চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয় রণাঙ্গনের বীর সন্তানকে।
পিরোজপুরের মাটিতে ঘটে যাওয়া এই অবর্ণনীয় করুণ ঘটনাটি কেবল একটি পরিবারের স্বজন হারানোর শোক বা দুর্গতি নয়; বরং স্বাধীন বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাস ও জাতীয় মূল্যবোধের ওপর এক গভীর আঘাত হিসেবে দেখছেন স্থানীয় সচেতন মহল। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার মরদেহের প্রতি এমন আচরণ এবং তাঁর অবলা পরিজনদের এমন মর্মান্তিক অসহায়ত্বের ঘটনা দেশের বিবেকবান মানুষকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে।
এস এম সোহাগ ফরাজী