নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তায় সম্প্রীতির অনন্য নজির স্থাপন করে উদযাপিত হলো দুর্গাপূজা: আগামী নির্বাচন তত্ত্বাবধায়কেই হবে, স্পষ্ট জানালেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
নিজস্ব প্রতিবেদক:
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আগাম প্রস্তুতি, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সার্বক্ষণিক নজরদারি এবং জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে বাংলাদেশে ধর্মীয় সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল ও নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে শারদীয় দুর্গাপূজা উদযাপিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
একই সঙ্গে তিনি দৃঢ়তার সাথে পুনর্ব্যক্ত করেছেন যে, দেশের আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবশ্যই নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই অনুষ্ঠিত হবে এবং এজন্য আইনসভায় সংবিধানে প্রয়োজনীয় সংশোধনী এনে তা প্রতিস্থাপন করা হবে।
আজ রবিবার (২৫ অক্টোবর ২০২৬) দুপুরে বাংলাদেশ সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে দেশের সমসাময়িক সার্বিক আইনশৃঙ্খলা ও জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ে আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
পূজায় সর্বোচ্চ মণ্ডপ ও নজিরবিহীন সরকারি উদ্যোগ:
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “পুলিশ, বিজিবি, আনসার, গোয়েন্দা সংস্থা এবং সাংবাদিকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ছাড়াই অত্যন্ত উৎসবমুখর পরিবেশে দুর্গাপূজা সম্পন্ন হয়েছে। বিগত ১৫-১৭ বছর দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে নানা অপতৎপরতা ও সম্প্রীতি বিনষ্টের চেষ্টা দেখা যেত, বর্তমান সরকার দেশকে সেই অপসংস্কৃতি থেকে সফলভাবে মুক্ত করতে পেরেছে।”
তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে এবারই সর্বোচ্চ সংখ্যক—৩৩ হাজার ৮৫১টি মণ্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এবার ঘটনার পর ব্যবস্থার বদলে ডিজিটাল অ্যাপসের মাধ্যমে তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত আগাম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ায় অশুভ চক্রের কয়েকটি নাশকতার ছক অঙ্কুরেই নস্যাৎ করা সম্ভব হয়। এছাড়া মণ্ডপগুলোর জন্য সরকারি অনুদান ৪ কোটি থেকে বাড়িয়ে ৫ কোটি টাকায় উন্নীত করা, চালের বরাদ্দ ৫০০ কেজি থেকে বাড়িয়ে ৬০০ কেজি করা এবং টানা ৫ দিনের ছুটি নিশ্চিত করার মাধ্যমে সরকার সম্প্রীতিময় বাংলাদেশের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
গোপালগঞ্জে পুলিশের ওপর হামলা ও সাজেক পরিস্থিতি:
গোপালগঞ্জ সদরের বেদগ্রাম খেয়াঘাট এলাকায় পুলিশের ওপর হামলার বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, নিষিদ্ধঘোষিত আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠন ছাত্রলীগ-যুবলীগের সন্ত্রাসীরা টহলরত পুলিশের ওপর হামলা ও গাড়ি ভাঙচুর করেছে। সংখ্যায় কম থাকায় পুলিশ সাময়িক আক্রান্ত হলেও ভিডিও ফুটেজ দেখে চিহ্নিত অপরাধীদের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে সাঁড়াশি অভিযান ও আইনি পদক্ষেপ শুরু হয়েছে।
এদিকে পার্বত্য জেলা সাজেকের পরিস্থিতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ক্ষুদ্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টায় পর্যটন মৌসুমে কিছুটা উত্তেজনা তৈরি হলেও বর্তমানে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ শান্ত ও নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সেনাবাহিনী ও পুলিশের কঠোর নজরদারির পাশাপাশি স্থানীয় সংসদ সদস্য ওয়াদুদ ভূঁইয়াসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ যৌথভাবে রাজনৈতিক আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন।
ডিআইজির বাসভবনে অভিযান ও শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ:
ছুটির মধ্যে এক অতিরিক্ত ডিআইজির বাসভবনে অভিযান ও ৮৫ জনকে সাজার প্রসঙ্গে মন্ত্রী সাফ জানিয়ে দেন, অভিযুক্তের প্রশাসনিক পরিচয় বিবেচনা না করে তাঁকে ইতিমধ্যে প্রত্যাহার করে সংযুক্ত করা হয়েছে এবং তাঁর বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে বিভাগীয় মামলাসহ অন্যান্য ব্যবস্থা চলমান রয়েছে।
সামাজিক মাধ্যমে বিদেশে পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করতে আইন ও দ্বিপক্ষীয় প্রত্যর্পণ (এক্সট্রাডিশন) চুক্তি অনুযায়ী পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রতিবেশী দেশকে একাধিকবার আনুষ্ঠানিক অনুরোধপত্র পাঠানো হয়েছে। গণঅভ্যুত্থানের মুখে পালিয়ে যাওয়া কোনো গণহত্যাকারী বা পলাতক অপরাধীকে দেশে নতুন করে কোনো অস্থিতিশীলতা বা অপতৎপরতা চালাতে দেওয়া হবে না।”
তত্ত্বাবধায়ক সরকারে ফিরছে নির্বাচন:
জাতীয় নির্বাচন নিয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ অত্যন্ত সুস্পষ্ট ভাষায় বলেন, “আগামী জাতীয় নির্বাচন কোনো দলীয় সরকারের অধীনে নয়, বরং অবশ্যই নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হবে। এটি রাজনৈতিক সমঝোতা ও ঐতিহাসিক আন্দোলনের মূল জাতীয় অঙ্গীকার। সর্বোচ্চ আদালত থেকে সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের বিতর্কিত রায় বাতিলের মাধ্যমে এটি বিচার বিভাগীয়ভাবে পুনর্বহাল (রিভাইভ) হয়েছে। এখন আইনসভার মাধ্যমে সংবিধানে প্রয়োজনীয় সংশোধনী এনে পূর্ণাঙ্গভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্স্থাপন করা হবে।”
এস এম সোহাগ ফরাজী