১০ হাজার টাকার সংসার থেকে বিশ্বসেরা হার্ভার্ডে: মৌলভীবাজারের চা-শ্রমিকের মেয়ে শান্তার অবিশ্বাস্য স্বপ্নজয়
স্টাফ রিপোর্টার:
মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার প্রত্যন্ত লংলা চা বাগানের শ্রমিক লাইনের জীর্ণ এক চালাঘরে জন্ম শান্তা যাদবের। নুন আনতে পান্তা ফুরানোর টানাপোড়েনের সেই সংসার থেকেই এবার বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ বিদ্যাপীঠ যুক্তরাষ্ট্রের ‘হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলে’ উচ্চশিক্ষার হাতছানি পেয়েছেন তিনি। বিশ্বখ্যাত এই প্রতিষ্ঠানে পড়ার জন্য প্রায় ২ কোটি টাকা সমমূল্যের মর্যাদাপূর্ণ পূর্ণকালীন আন্তর্জাতিক বৃত্তি অর্জন করেছেন এই অদম্য তরুণী।
শান্তার বাবা লক্ষ্মী নারায়ণ যাদব ও মা—উভয়েই চা বাগানের দিনমজুর শ্রমিক। দুজনে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে প্রতি মাসে যে পারিশ্রমিক পান, তার সমষ্টি ১০ হাজার টাকারও কম। তীব্র আর্থিক প্রতিকূলতা ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সীমাবদ্ধতার প্রাচীর ভেঙে শান্তা হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের ‘মাস্টার অব মেডিকেল সায়েন্স ইন গ্লোবাল হেলথ ডেলিভারি’ প্রোগ্রামে পড়ার অনন্য সুযোগ ছিনিয়ে নিয়েছেন।
অভাবের সংসারে লড়াই করে শিক্ষার ভিত:
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, লংলা চা বাগানের স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই শান্তার শিক্ষাজীবনের শুরু। ছোটবেলা থেকেই মেধার স্বাক্ষর রাখা শান্তা পরবর্তীতে কুলাউড়ার স্বনামধন্য ক্যামেলিয়া ডানকান ফাউন্ডেশন স্কুল থেকে মাধ্যমিক (এসএসসি) এবং শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) সম্পন্ন করেন।
এরপর তিনি আন্তর্জাতিক স্কলারশিপ নিয়ে চট্টগ্রামের খ্যাতনামা এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনে (এইউডব্লিউ) ভর্তি হন এবং সেখান থেকে সফলভাবে জনস্বাস্থ্য (পাবলিক হেলথ) বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
উচ্চশিক্ষার বৈশ্বিক মঞ্চে নিজেকে প্রমাণের লড়াইয়ে হার্ভার্ডে সুযোগ পাওয়ার আগে বিশ্বের অন্তত ১৬টি শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষার প্রস্তাব ও ফেলোশিপ পেয়েছিলেন শান্তা। তবে নিজ জন্মভূমির অবহেলিত মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা বিবেচনায় তিনি বিশ্বসেরা হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের ডিগ্রিকেই চূড়ান্তভাবে বেছে নেন।
বাস্তব জীবনের বঞ্চনা থেকেই জনস্বাস্থ্যে আগ্রহ:
শান্তার কাছে জনস্বাস্থ্য কেবল কোনো পাঠ্যবইয়ের তাত্ত্বিক পাঠ নয়, বরং নিজের জীবন দিয়ে প্রত্যক্ষ করা এক নির্মম বাস্তবতা। চা বাগানের সুবিধাবঞ্চিত শ্রমিকেরা গুরুতর অসুস্থ হলে সময়মতো ও মানসম্মত চিকিৎসার জন্য কীভাবে দিগ্বিদিক ছোটেন, তা তিনি শৈশব থেকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন। প্রাথমিক প্রয়োজনীয় ওষুধ ও ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবা পেতে দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে মাইলের পর মাইল দূরে যাওয়া এবং নানামুখী অর্থনৈতিক অবহেলা চা জনগোষ্ঠীর জীবনের প্রাত্যহিক অংশ। এসব বঞ্চনা ও স্বাস্থ্যহীনতার চিত্রই তাঁকে বড় হয়ে জনস্বাস্থ্য নিয়ে পড়ার মূল অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল।
মেয়ের এই ঐতিহাসিক সাফল্যে আবেগাপ্লুত বাবা লক্ষ্মী নারায়ণ যাদব বলেন, “ছোটবেলা থেকেই আমার মেয়ে পড়াশোনার প্রতি পাগল ছিল। আমাদের চরম অভাব-অনটনের কারণে ইচ্ছা থাকলেও তাকে শহরের বড় কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াতে পারিনি। তবে ওর মেধা আর অদম্য জেদ দেখে মনে গভীর বিশ্বাস ছিল, ও একদিন বড় কিছু করবে।”
কমিউনিটির তরুণদের নিয়ে ভাবনা ও ভবিষ্যৎ স্বপ্ন:
শুধু নিজের পড়াশোনায় সীমাবদ্ধ থাকেননি শান্তা। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি চা ছাত্র সংসদের শিক্ষা ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। সে সময় বাগান এলাকার পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধ এবং তাদের উচ্চশিক্ষার আঙিনায় পৌঁছাতে নিয়মিত দিকনির্দেশনা ও উদ্বুদ্ধকরণ কর্মশালা পরিচালনা করেন তিনি।
হার্ভার্ডে আন্তর্জাতিক মানের পড়াশোনা ও উচ্চতর প্রশিক্ষণ শেষ করে আবারও নিজের শেকড়ে ফিরে আসতে চান শান্তা যাদব। তাঁর আজীবনের স্বপ্ন—অবহেলিত চা শ্রমিক ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষের সুচিকিৎসা, স্বাস্থ্যসেবার সহজলভ্যতা এবং জীবনমান টেকসইভাবে উন্নয়নে নিজেকে উৎসর্গ করা।
এস এম সোহাগ ফরাজী