বাংলাদেশ বাউল সমিতিতে তীব্র বিভক্তি: কেন্দ্রীয় কমিটি ও বঞ্চিত শিল্পীদের মুখোমুখি অবস্থানে অস্থিরতা
নিজস্ব প্রতিবেদক, দৈনিক জীবনযাত্রা
সিলেট প্রতিনিধি: শাহ তোফাজ্জুল হোসেন ভান্ডারী
সিলেট:
ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠন বাংলাদেশ বাউল সমিতির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নিয়ে অভ্যন্তরীণ বিরোধ এখন চরমে পৌঁছেছে। বর্তমান কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটি এবং সিলেটসহ বিভিন্ন জেলার বাদপড়া প্রবীণ-নবীন শিল্পীদের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি ও কড়া বিবৃতিতে সারা দেশের বাউল অঙ্গনে সৃষ্টি হয়েছে চরম বিশৃঙ্খলা ও অস্থিরতা।
প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট ও ধারাবাহিকতা:
২০০৫ সালে মরহুম শাহজাহান সাদুল্লাপুরী ভান্ডারীর অক্লান্ত পরিশ্রমে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ বাউল সমিতি। রাজধানীর মিরপুরে হযরত শাহ আলী বোগদাদী (রহ.) মাজার সংলগ্ন অস্থায়ী কার্যালয় থেকে শুরু হওয়া এ সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে আমৃত্যু দায়িত্ব পালন করেন তিনি। সমিতির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, প্রতি মেয়াদের শেষে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক সারা দেশের সদস্যদের ডেকে মতামতের ভিত্তিতে গণতান্ত্রিকভাবে কার্যকরী কমিটি গঠন করতেন। দীর্ঘ দুই দশক ধরে সংগঠনটি এ নিয়মেই পরিচালিত হয়ে আসছিল।
৫ আগস্ট-পরবর্তী নাটকীয় পটপরিবর্তন:
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পূর্ব পর্যন্ত সমিতির দায়িত্বে ছিলেন সভাপতি মহারাজ আবুল সরকার ও সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নির্ধারিত মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই তাঁদের বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ তুলে পূর্ববর্তী নেতৃত্বকে বাদ দিয়ে একটি নতুন আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়।
এতে সভাপতি হিসেবে আব্দুল হালিম (সাগর চাঁন) এবং সাধারণ সম্পাদক হিসেবে বাউল বারেক বৈদেশী দায়িত্ব গ্রহণ করেন। অভিযোগ রয়েছে, নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি আত্মপ্রকাশের আগেই সারা দেশের সব জেলা কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয় এবং পরবর্তীতে সাধারণ সদস্যদের বৃহৎ অংশের মতামত ছাড়াই কেন্দ্রীয় কমিটি চূড়ান্ত করা হয়।
সিলেট থেকে প্রতিবাদের সূত্রপাত:
অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় কমিটি গঠনের অভিযোগ তুলে প্রথম তীব্র প্রতিবাদ শুরু হয় সিলেট থেকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদী লাইভ, মতবিনিময় সভা ও বিবৃতির মাধ্যমে বর্তমান আহ্বায়ক কমিটির বিরুদ্ধে সোচ্চার হন স্থানীয় বাউল শিল্পীরা।
বিশেষ করে সিলেট বিভাগের সাবেক বিভাগীয় সমন্বয়কারী ফিরুজ আহমদ এ প্রতিবাদে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তাঁর অভিযোগ, কেন্দ্রীয় কমিটি পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে সিলেট বিভাগের কোনো ইউনিটের সঙ্গেই সমন্বয় করা হয়নি। এমনকি মূল কমিটির বাইরের তিনজনকে সরাসরি কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি পদে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ বৈষম্যের প্রতিবাদে ফিরুজ আহমদসহ সিলেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ শিল্পীরা কেন্দ্রীয় কমিটির কোনো সিদ্ধান্ত বা নির্দেশনা মানতে অস্বীকৃতি জানান।
পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি ও উত্তেজনা:
আহ্বায়ক কমিটির কার্যক্রমকে বয়কট করে গত ২৯ আগস্ট ২০২৬ সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বিভাগের চার জেলার বাউল শিল্পীদের অংশগ্রহণে এক বিশাল “বাউল মেলা”র আয়োজন করেন ফিরুজ আহমদ। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব লাইভে এসে এ আয়োজন বন্ধের আহ্বান জানালেও তা উপেক্ষা করা হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় আজ বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬) নগরের নজরুল একাডেমীতে “বাংলাদেশ বাউল সমিতি সিলেট জেলা কমিটি”র আনুষ্ঠানিক অভিষেক অনুষ্ঠানের ডাক দিয়েছেন ফিরুজ আহমদপন্থীরা। বিষয়টি নজরে আসার পর গতকাল বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) রাতে লাইভে এসে কেন্দ্রীয় নেতারা ফিরুজ আহমদকে এ ধরনের পৃথক কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেন এবং অন্যথায় সাংগঠনিক ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের হুঁশিয়ারি দেন। তবে সব হুমকি উপেক্ষা করেই অনুষ্ঠান সফল করতে অনড় অবস্থানে রয়েছেন সিলেট অঞ্চলের বাদপড়া শিল্পীরা।
রাজনৈতিক কাদা-ছোড়াছুড়ি ও বাউল সমাজের উদ্বেগ:
সংগঠনের এই সংকটের মধ্যে নতুন মাত্রা যোগ করেছে রাজনৈতিক বিতর্ক। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী বাউল দলের সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার রেজাউল ইসলাম রেজা এক বক্তব্যে বাউল সমিতির সভাপতি আব্দুল হালিমের বিরুদ্ধে সমিতি দখল এবং কিছু শিল্পীকে ‘আওয়ামী লীগের দোসর’ বলে আখ্যা দেন। এর প্রতিবাদ জানিয়ে আব্দুল হালিম পক্ষ থেকে রেজাকে জনসমক্ষে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানানো হয়। পরবর্তীতে রেজাউল ইসলাম রেজা আবারও লাইভে এসে পাল্টা জবাব দিলে বিষয়টি নিয়ে শিল্পীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়। তবে জাতীয়তাবাদী বাউল দলের আহ্বায়ক সুফি সাধক ও গীতিকার আরিফ দেওয়ান এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো মন্তব্য করেননি।
সার্বিক পরিস্থিতিতে দেশের হাজার হাজার বাউল শিল্পী গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, বিভিন্ন স্থানে যখন বাউল গান, মাজারের ওরশ মাহফিল এবং বাউল বেশভূষার ওপর নানামুখী আঘাত আসছে, তখন শিল্পীদের এমন আত্মঘাতী বিভক্তি বাউল সংস্কৃতিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিচ্ছে। বিজ্ঞজনদের দাবি, বাউল সমিতি, বাউল ফাউন্ডেশন বা ফেডারেশনকে সম্পূর্ণ দলীয় রাজনীতিমুক্ত রাখতে হবে। সাধারণ শিল্পীদের প্রত্যাশা—সব পক্ষ অহমিকা ভুলে অবিলম্বে টেবিলে বসে আলোচনার মাধ্যমে এ সংকট নিরসন করে আবহমান বাংলার বাউল ঐতিহ্যকে রক্ষা করবে।
এস এম সোহাগ ফরাজী