আজ বঙ্গবীর জেনারেল ওসমানীর ১০৮তম জন্মদিন: ৯ মাসে পাকবাহিনীর আত্মসমর্পণের মহান রূপকার
শাহ তোফাজ্জুল হোসেন ভান্ডারী:
আজ ১ সেপ্টেম্বর, মহান মুক্তিযুদ্ধের সশস্ত্র বাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক বঙ্গবীর জেনারেল মুহম্মদ আতাউল গণি ওসমানীর (এম. এ. জি. ওসমানী) ১০৮তম জন্মদিন। তাঁর বলিষ্ঠ, দূরদর্শী ও রণকৌশলগত নেতৃত্বের ওপর ভর করেই মাত্র নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে পর্যুদস্ত করে আত্মসমর্পণে বাধ্য করেছিল বীর বাঙালি।
সৈনিক জীবন ও সামরিক কৃতিত্ব
সামরিক জীবনে এম. এ. জি. ওসমানী ছিলেন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তৎকালীন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সর্বকনিষ্ঠ মেজর হওয়ার বিরল গৌরব অর্জন করেছিলেন তিনি। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে তিনি বাঙালি অফিসার ও সৈনিকদের সমন্বয়ে ‘ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট’ গড়ে তোলায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। বাহিনীর প্রতি তাঁর পিতা-তুল্য স্নেহ, প্রজ্ঞা ও অটুট শৃঙ্খলার কারণে সামরিক অঙ্গনে তিনি গভীর শ্রদ্ধাভরে “পাপা টাইগার” নামে সমাদৃত ছিলেন। তবে অদম্য বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা ও ন্যায়পরায়ণতার কারণে তৎকালীন পাকিস্তানি সামরিক শাসকদের বিরাগভাজন হন তিনি, যার ফলে তাঁর প্রাপ্য পদোন্নতি আটকে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ১৯৬৭ সালে কর্নেল পদে থাকাবস্থায় তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেন।
রাজনীতিতে অভিষেক ও মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব
সামরিক জীবন থেকে অবসরের পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অনুরোধে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগে যোগ দেন। ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচনে সিলেটের বালাগঞ্জ, বিশ্বনাথ ও ফেঞ্চুগঞ্জ আসন থেকে বিপুল ভোটে এমএলএ (জাতীয় পরিষদ সদস্য) নির্বাচিত হন।
১৯৭১ সালে পাকিস্তানি জান্তার বর্বরোচিত গণহত্যার মুখে বাংলাদেশের মুক্তির সংগ্রাম শুরু হলে ওসমানীর সামরিক নেতৃত্ব অনিবার্য হয়ে ওঠে। ১৯৭১ সালের ৪ এপ্রিল সিলেটের তেলিয়াপাড়া চা বাগানে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের শীর্ষ অফিসারদের নিয়ে এক ঐতিহাসিক গোপন বৈঠকে তিনি সমন্বিত সশস্ত্র প্রতিরোধের ভিত্তি স্থাপন করেন। পরবর্তীতে ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে মুজিবনগর সরকার গঠিত হলে তাঁকে মন্ত্রী পদমর্যাদায় মহান মুক্তিযুদ্ধের মুক্তিবাহিনী ও সমগ্র সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান সেনাপতি (সর্বাধিনায়ক) নিযুক্ত করা হয়।
রণকৌশল ও রণাঙ্গন পরিচালনা
রণাঙ্গনে ওসমানীর সুযোগ্য পরিকল্পনা যুদ্ধকে দ্রুত বিজয়ের দিকে নিয়ে যায়। তিনি সমগ্র বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে বিভক্ত করে সুদক্ষ সেক্টর কমান্ডারদের নিয়োগ দেন। সেক্টরগুলোর সার্বিক রণকৌশল তৈরি, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে সমন্বয় করে রণাঙ্গনে আধুনিক সমরাস্ত্র ও রসদ সরবরাহ নিশ্চিত করার মূল দায়িত্বে ছিলেন তিনি। চরম বিপদের মুখেও তিনি নিয়মিত বিভিন্ন সেক্টরের রণাঙ্গনে গিয়ে মুক্তিসেনাদের মনোবল বাড়াতেন। তাঁর আপসহীন সামরিক নেতৃত্ব ও দৃঢ়তায় যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর বুকে গভীর আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছিল।
স্বাধীন বাংলাদেশের ‘বঙ্গবীর’
স্বাধীনতা অর্জনের পর রণাঙ্গনে অসামান্য বীরত্ব ও নেতৃত্বগুণের স্বীকৃতিস্বরূপ স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার তাঁকে কর্নেল থেকে ‘জেনারেল’ পদে উন্নীত করে। একই সঙ্গে বাঙালি জাতি তাঁকে কৃতজ্ঞচিত্তে ‘বঙ্গবীর’ উপাধিতে ভূষিত করে। সিলেটের গর্বিত এই কৃতি সন্তান শুধু বৃহত্তর সিলেটবাসীর নয়, সমগ্র বাঙালি জাতির চিরকালীন গর্ব ও অনুপ্রেরণার প্রতীক। তাঁর জন্মবার্ষিকীতে এই মহান দেশপ্রেমিকের স্মৃতির প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।