মনে করো স্বপ্ন দেখছ’ বলে ঘটনার ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা; বিএনপি নেতাসহ কমিটির সালিস পণ্ড করে পুলিশি অভিযান
বিশেষ প্রতিনিধি, কুষ্টিয়া:
কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে ১০ বছর বয়সী এক শিশু শিক্ষার্থীকে যৌন নির্যাতনের (বলাৎকার) চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে এক মাদরাসা শিক্ষকের বিরুদ্ধে। ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী ও মাদরাসা পরিচালনা পর্ষদ সালিস বৈঠক বসালেও শেষ রক্ষা হয়নি। স্থানীয়দের ক্ষোভ ও খবর পেয়ে তাৎক্ষণিক অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত শিক্ষককে আটক করেছে কুমারখালী থানা পুলিশ।
মঙ্গলবার (২১ জুলাই) বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে উপজেলার সদকী ইউনিয়নের তালোয়া হাফেজিয়া মাদরাসা ও লিল্লাহ বোর্ডিং থেকে অভিযুক্ত শিক্ষক মো. মোস্তাফিজুর রহমানকে আটক করা হয়। আটক মোস্তাফিজুর রহমান ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলার তাহেরহুদা ইউনিয়নের বাসিন্দা। পুলিশ ভুক্তভোগী শিশু ও তার বাবাকে সুরক্ষার স্বার্থে নিজেদের হেফাজতে নিয়েছে।
ঘটনা প্রকাশ্যে এল যেভাবে
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ১২ জুলাই সকালে মাদরাসার বড় শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দিতে গেলে একটি কক্ষে পাঁচজন শিশু শুয়ে ছিল। সকাল ১১টার দিকে মাদরাসার শিক্ষক মোস্তাফিজুর রহমান এক মক্তব শিক্ষার্থীকে বলাৎকার করেন। বিষয়টি কক্ষে থাকা অন্য শিশুরা দেখে ফেললেও ভয়ে কেউ মুখ খোলেনি।
পরবর্তীতে বিষয়টি জানাজানি হলে মঙ্গলবার দুপুরে এক শিশুকে মারধর করেন ওই শিক্ষক। এতে সন্দেহ জাগলে স্থানীয়রা এগিয়ে আসে এবং ভয়াবহ বলাৎকারের ঘটনাটি প্রকাশ্যে চলে আসে।
নির্যাতনের শিকার শিশুটি পুলিশ আসার আগে জানায়,
“১২ তারিখ সকালে ঘুমিয়ে ছিলাম। সে সময় হুজুর এসে আমার সঙ্গে জিনা (বলাৎকার) করে। আমি চোখ খুললে হুজুর মাথায় হাত দিয়ে বলে— ‘মনে করো তুমি স্বপ্ন দেখতেছ’।”
ফৌজদারি অপরাধে সালিসের অপচেষ্টা
ঘটনা জানাজানি হওয়ার পরপরই বেলা ২টার দিকে তা ধামাচাপা দিতে মাদরাসা প্রাঙ্গণে পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা তড়িঘড়ি করে সালিস বৈঠক বসান। বৈঠকে মাদরাসা কমিটির সভাপতি মো. জুলফিকার মাহমুদ, সহ-সভাপতি ও জগন্নাথপুর ইউনিয়ন বিএনপি নেতা আব্দুল করিমসহ অন্যান্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। প্রাথমিক বৈঠকে বিষয়টি রফা করার চেষ্টা হয় এবং পরদিন বড় পরিসরে বৈঠকের সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছিল।
বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে সংবাদ সংগ্রহে সাংবাদিকরা সেখানে উপস্থিত হলে সালিস কক্ষের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরে কমিটির নেতারা বের হয়ে বারান্দায় বসে আলোচনা শুরু করেন। গুরুতর ফৌজদারি অপরাধে সালিস বসানোর সুযোগ নিয়ে প্রশ্ন উঠলে মাদরাসা সভাপতি জুলফিকার মাহমুদ দাবি করেন, “বিষয়টি স্থানীয়ভাবে মীমাংসার সুযোগ রয়েছে।”
তবে আটক শিক্ষক মোস্তাফিজুর রহমান সব অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেন, শিক্ষার্থীরা তার বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য দিচ্ছে।
পুলিশি ব্যবস্থা ও বর্তমান পরিস্থিতি
সালিসের খবর চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে বিপুল সংখ্যক উৎসুক জনতা মাদরাসা চত্বরে ভিড় জমায়। খবর পেয়ে কুমারখালী থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে অভিযুক্ত শিক্ষককে আটক করে।
কুমারখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জামাল উদ্দিন জানান, “শিশু নির্যাতনের মতো গুরুতর অপরাধে আইনগতভাবে কোনো সালিস-বৈঠকের সুযোগ নেই। সংবাদ পেয়েই পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে অভিযুক্তকে আটক করেছে। প্রাথমিক তদন্তে ঘটনার সত্যতা মিলেছে এবং অভিযুক্তের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।”
দৈনিক জীবন যাত্রা
প্রকাশক ও সম্পাদক: এস এম সোহাগ ফরাজী