জগন্নাথপুরে কৃষক সেলিম হত্যার ১০ দিন পেরিয়ে গেলেও ধরাছোঁয়ার বাহিরে ২৩ আসামি
জগন্নাথপুর (সুনামগঞ্জ) স্টাফ রিপোর্টার, শাহ্ তোফাজ্জুল হোসেন ভান্ডারী | দৈনিক জীবনযাত্রা:
সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার মীরপুর ইউনিয়নের উত্তর গড়গড়ি গ্রামে ধানের হালির (বীজ) চারা নষ্টের প্রতিবাদ করায় কৃষক মোঃ সেলিম উদ্দিনকে (সেলিম মিয়া) প্রকাশ্য দিবালোকে নৃশংসভাবে পিটিয়ে ও সুলফি দিয়ে গেঁথে হত্যার ১০ দিন পেরিয়ে গেছে। তবে এ ঘটনায় এজাহারভুক্ত ২৩ জন আসামির একজনকেও গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।
আসামিদের ধরতে মামলার বাদী ফজল মিয়া থানায় বারবার যোগাযোগ করলেও মামলার দায়িত্বে থাকা তদন্ত কর্মকর্তা (ইনভেস্টিগেশন অফিসার) ‘ধরছি-ধরবো’ বলে কেবলই কালক্ষেপণ করছেন ও দায়িত্ব এড়িয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। পুলিশের এমন গড়িমসি ও উদাসীনতায় নিরুপায় হয়ে নিহতের পরিবার ও বাদীপক্ষ গণমাধ্যমের কাছে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। খুনিদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও ফাঁসির দাবিতে সর্বস্তরের জনগণকে সঙ্গে নিয়ে এলাকায় বিশাল গণ-মানববন্ধনের ডাক দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
ধানের চারা খাওয়া নিয়ে বিরোধের জেরে বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড
মামলার এজাহার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ১০ জুলাই (২০২৬) শুক্রবার সকাল ৮টার দিকে উত্তর গড়গড়ি গ্রামের কৃষক জমির আলী ও আওলাদ আলী তাঁদের জমিতে ধানের জালা ফলানোর জন্য ছোট ভাই ভিকটিম সেলিম মিয়া ও চাচাতো ভাই গিয়াস উদ্দিনসহ চারজন মিলে মাঠে চাষ করছিলেন। এর দুই দিন আগে গ্রামের বাসিন্দা আব্দুর জব্বারের ছেলে দুলাল মিয়ার (৩৮) গরু জমির আলীর প্রায় ২৫-৩০টি রোপণকৃত কদম গাছের চারা খেয়ে নষ্ট করে ফেলেছিল।
ঘটনার দিন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে আবারও দুলাল মিয়ার ৩টি গরু জমিতে এসে টুকরিতে রাখা ধানের বীজের জালা (হালির চারা) খেতে শুরু করে। এ সময় চাষরত গিয়াস উদ্দিন গরু তাড়িয়ে দিয়ে দুলাল মিয়াকে বলেন, “তোমার গরু দুদিন আগে কদম গাছ নষ্ট করলো, আজ আবার ধানের বীজ খেয়ে ফেললো।” এতে ২ নং আসামি দুলাল মিয়া চরম রাগান্বিত হয়ে বলে, “আমার গরু বান্দিয়া রাখতে পারবো না, তোমরা পারলে কিচ্ছু করিও।” এ নিয়ে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে স্থানীয়রা দুলালকে বাড়ি পাঠিয়ে দেন এবং কৃষকদের কাজ করতে বলেন।
বাড়ি গিয়ে দুলাল মিয়া তার লোকজনকে উত্তেজিত করে তোলে। বেলা আনুমানিক ১১টার দিকে দুলালসহ উত্তর গড়গড়ি কান্দি গ্রামের ২০-২৫ জন লোক লাঠিসোঁটা, সুলফি, দা, রামদা ও ডেগারসহ দেশীয় মারণাস্ত্রে সজ্জিত হয়ে মাঠে কাজ করা সেলিম ও তাঁর ভাইদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। ৩ নং আসামি জিয়াউল হকের হুকুমে (“সবাইকে প্রাণে মেরে ফেলো”) ২ নং আসামি দুলাল ও ৩ নং আসামি জিয়াউল হক ভিকটিম সেলিমের দুই হাত চেপে ধরে।
এ সময় ১ নং আসামি কাজল মিয়া তার হাতে থাকা ধারালো ‘সুলফি’ দিয়ে হত্যার উদ্দেশ্যে সেলিমের গলার ডান পাশে সজোরে ঘাই (আঘাত) মারে। সুলফি বিদ্ধ হয়ে সেলিম সাথে সাথে মাটিতে ঢলে পড়লে দুলাল ও জিয়াউল লাঠি দিয়ে তার ডান পায়ের হাঁটুর নিচে এলোপাতাড়ি পিটিয়ে পা থেঁতলে দেয় এবং ঘটনাস্থলেই সেলিমের মৃত্যু নিশ্চিত করে।
এ সময় বাধা দিতে গেলে আসামিদের সুলফি ও রামদার কোপে গুরুতর আহত হন নিহতের চাচাতো ভাই রফিক মিয়া ও শফিক মিয়া। ৪ নং আসামি হিরন মিয়া ও ৫ নং আসামি রাজিক মিয়া রফিকের বুকে ও নাভিতে সুলফি দিয়ে এবং ৬ নং আসামি ফুল মিয়া ও ৭ নং আসামি আতিক মিয়া রামদা দিয়ে কুপিয়ে তাকে রক্তাক্ত জখম করে। এছাড়া ১০ নং আসামি তারা হোসেন ও ৯ নং আসামি আপ্তাব হোসেন শফিক মিয়ার বুকে সুলফি দিয়ে ঘাই মেরে গুরুতর জখম করে। আহতরা বর্তমানে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
আসামিদের কলোনি ও প্রভাব: অবরুদ্ধ নিহতের পরিবার
এ ঘটনায় নিহতের চাচা ফজল মিয়া বাদী হয়ে একই গ্রামের ২৩ জনকে নামীয় এবং অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকে আসামি করে জগন্নাথপুর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
মামলার এজাহারভুক্ত ২৩ আসামি হলেন:
১. কাজল মিয়া (৪০), পিতা- আব্দুর রজ্জাক; ২. দুলাল মিয়া (৩৮), পিতা- আব্দুল জব্বার; ৩. জিয়াউল হক (৩৬), পিতা- আব্দুল মতলিব (লাল মিয়া); ৪. হিরন মিয়া (৪৪), পিতা- মৃত আব্দুস সত্তার; ৫. রাজিক মিয়া (৩৯), পিতা- মৃত আব্দুস সত্তার; ৬. ফুল মিয়া (৩০), পিতা- আব্দুর রজ্জাক; ৭. আতিক মিয়া (৩৪), পিতা- মৃত আব্দুস সত্তার; ৮. আশিক মিয়া (৩৭), পিতা- মৃত আব্দুস সত্তার; ৯. আপ্তাব হোসেন (৪৮), পিতা- মৃত ইছবর আলী; ১০. তারা হোসেন (৪৪), পিতা- মৃত ইছবর আলী; ১১. হেলাল মিয়া (৩৫), পিতা- আব্দুল জব্বার; ১২. রাজু মিয়া (২৪), পিতা- হিরন মিয়া; ১৩. সোনা মিয়া (৫০), পিতা- আব্দুর রজ্জাক; ১৪. সুজন মিয়া (৩৮), পিতা- আব্দুর রজ্জাক; ১৫. সাজ্জাদ মিয়া (৫০), পিতা- মৃত আব্দুল গফুর; ১৬. ইরন মিয়া (২৩), পিতা- মৃত কালা মিয়া; ১৭. নুর মিয়া (৫০), পিতা- মৃত আব্দুল খালেক; ১৮. কাইয়ুম মিয়া (৪৪), পিতা- আব্দুল মতলিব (লাল মিয়া); ১৯. হারুন মিয়া (৪৭), পিতা- মৃত আব্দুল হক; ২০. আব্দুস সুপান (৫৫), পিতা- মৃত মছদ্দর আলী; ২১. আব্দুর রব (৫৫), পিতা- মৃত মছদ্দর আলী; ২২. সুনুর মিয়া (৫৫), পিতা- আব্দুল মন্নান এবং ২৩. ফরিদ মিয়া (৩৫), পিতা- আব্দুল মন্নান। তারা সকলেই জগন্নাথপুর থানার উত্তর গড়গড়িকান্দি (ডাক: টুকের বাজার) গ্রামের বাসিন্দা।
নিহত সেলিম মিয়ার ভাই কান্নাজড়িত কণ্ঠে এই প্রতিবেদকের কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,
”আসামিরা চরম দাঙ্গাতি ও সন্ত্রাসী প্রকৃতির লোক। তারা গায়ের জোরে সকল সময় চলাফেরা করে এবং আইনকানুনের তোয়াক্কা করে না। তারা ধনাঢ্য ও প্রভাবশালী হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে গ্রামের কেউ কথা বলতে সাহস পায় না। তারা গায়ের জোরে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে আমাদের নিজেদের বাড়ির পাশে ক্ষেতের জমিতে বা হাওরে নামার একমাত্র যাতায়াতের রাস্তাটুকুও বন্ধ করে দিয়েছে। আজ আমার ভাই খুন হওয়ার ১০-১২ দিন পার হয়ে গেল, পুলিশ একটা আসামিকেও ধরতে পারল না। আমরা আর চুপ থাকব না, খুনিদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে আমরা অচিরেই বিশাল আকারে এক মানববন্ধনের ডাক দিচ্ছি।”
তদন্ত কর্মকর্তার এড়িয়ে যাওয়ার অভিযোগ
মামলার বাদী ফজল মিয়া জানান, আসামি ধরার জন্য তিনি নিয়মিত থানায় যোগাযোগ করছেন। কিন্তু মামলার দায়িত্বে থাকা তদন্ত কর্মকর্তা কেবলই আশ্বাস দিয়ে দিন পার করছেন এবং দায়িত্ব এড়িয়ে যাচ্ছেন, যা বাদীর মনে চরম অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে। তবে থানা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আসামিরা ঘটনার পর থেকেই এলাকা ছেড়ে পলাতক থাকায় তাদের অবস্থান শনাক্তে বিভিন্ন স্থানে সাঁড়াশি অভিযান চালানো হচ্ছে এবং দ্রুতই তাদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।
___________________________
সম্পাদক প্রকাশ
এস এম সোহাগ ফরাজী
দৈনিক জীবনযাত্রা!
_____________________________