গ্রিস যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে নিহত ১৮ বাংলাদেশি, মানব পাচার চক্রের সদস্য গ্রেফতার
অবৈধভাবে ইউরোপের দেশ গ্রিসে যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে অনাহার, তৃষ্ণা ও দুর্বিষহ যন্ত্রণায় প্রাণ হারানো ১৮ বাংলাদেশির মৃত্যুর ঘটনায় মানব পাচার চক্রের এক সদস্যকে গ্রেফতার করেছে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
গ্রেফতারকৃত ব্যক্তির নাম মোহাম্মদ মিকাইল ইসলাম (৫২)। তিনি সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই উপজেলার মিঠাপুর গ্রামের বাসিন্দা। সিআইডির মানব পাচার প্রতিরোধ (টিএইচবি) ইউনিট গত ১৫ জুন সিলেট বিমানবন্দর এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করে।
সিআইডি সূত্রে জানা যায়, নিহতদের একজন মাসুম (ছদ্মনাম) এবং গ্রেফতারকৃত মিকাইল একই গ্রামের বাসিন্দা। পরিবারের আর্থিক সংকট দূর করে উন্নত জীবনের আশায় মাসুম মানব পাচারকারীদের প্রলোভনে পড়ে ইউরোপ যাত্রার ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নেন।
পাচারকারী চক্রটি গ্রিসে পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে মাসুমের পরিবারের কাছ থেকে মোট ১৩ লাখ টাকা দাবি করে। এর মধ্যে লিবিয়ায় পাঠানোর জন্য ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং গ্রিসে পৌঁছানোর পর আরও ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা পরিশোধের শর্ত দেওয়া হয়।
তদন্তে জানা যায়, ঢাকায় ১৭ দিন অবস্থানের পর মাসুমকে লিবিয়ায় পাঠানো হয়। সেখানে পৌঁছানোর পর পরিবারের সদস্যরা চক্রের নির্দেশনা অনুযায়ী বিভিন্ন পর্যায়ে টাকা পরিশোধ করেন। পরে চলতি বছরের ২১ মার্চ ১৮ জন বাংলাদেশিসহ মোট ৪৫ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীকে অবৈধ সমুদ্রপথে গ্রিসের উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়।
যাত্রাপথে নৌযানটি কয়েকদিন ভূমধ্যসাগরে আটকা পড়ে। খাদ্য ও পানির তীব্র সংকটে যাত্রীরা অসুস্থ হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে অনাহার ও পানিশূন্যতায় প্রাণ হারান একাধিক ব্যক্তি। উদ্ধার হওয়া জীবিতদের ভাষ্য অনুযায়ী, পাচারকারীদের নির্দেশে মৃতদের লাশ সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হয়।
পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের মাধ্যমে মাসুমের পরিবার জানতে পারে যে নিহতদের মধ্যে তাদের স্বজনও রয়েছেন।
সিআইডির তদন্তে আরও জানা গেছে, সংঘবদ্ধ মানব পাচারকারী চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে বিদেশগমনেচ্ছু ব্যক্তিদের কাছ থেকে বিপুল অর্থ আদায় করে আসছিল। তারা বৈধ অভিবাসন প্রক্রিয়া এড়িয়ে লিবিয়া হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথে ইউরোপে পাঠানোর ব্যবস্থা করত এবং বিভিন্নভাবে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করত।
সিআইডি জানায়, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃত মিকাইল মানব পাচার কার্যক্রমে সম্পৃক্ত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। তাকে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।
বর্তমানে মামলার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। চক্রের অন্যান্য সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেফতার, আর্থিক লেনদেনের উৎস অনুসন্ধান এবং আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের সম্পৃক্ততা উদ্ঘাটনে কাজ করছে সিআইডি।
এদিকে বিদেশে কর্মসংস্থান, অভিবাসন কিংবা ভ্রমণের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র সরকার অনুমোদিত বৈধ প্রক্রিয়া অনুসরণের আহ্বান জানিয়েছে সিআইডি। একই সঙ্গে মানব পাচার, জাল ভিসা ও অভিবাসী চোরাচালান সংক্রান্ত কোনো তথ্য জানা থাকলে তা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানোর অনুরোধ করেছে সংস্থাটি।