টানা ৫ দিনের ছুটিতে সিলেটে পর্যটকদের উপচে পড়া ঢল: হোটেল-রিসোর্টে ঠাঁই নেই, অনেকে আশ্রয় নিচ্ছেন শাহজালাল মাজারে
শাহ তোফাজ্জুল হোসেন ভান্ডারী, সিলেট প্রতিনিধি:
শারদীয় দুর্গাপূজার সরকারি ছুটি এবং সাপ্তাহিক ছুটি মিলিয়ে টানা পাঁচ দিনের লম্বা অবকাশে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পর্যটন নগরী সিলেটে পর্যটকদের বাঁধভাঙা ঢল নেমেছে। চা-বাগান, পাহাড় আর নদীবেষ্টিত সিলেটের প্রতিটি দর্শনীয় স্থানে এখন দেশ-বিদেশের ভ্রমণপিপাসুদের পদচারণায় মুখরিত।
পর্যটকদের এই অপ্রত্যাশিত চাপে জেলার হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টগুলোর প্রায় শতভাগ কক্ষ সপ্তাহখানেক আগেই অগ্রিম বুকিং হয়ে গেছে। ফলে পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়া শেষ মুহূর্তে সিলেটে আসা বহু পর্যটক তীব্র আবাসন সংকটে পড়েছেন। কাঙ্ক্ষিত রুম না পেয়ে অনেকেই রাত কাটাতে আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি কিংবা বাধ্য হয়ে হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার প্রাঙ্গণে আশ্রয় নিচ্ছেন।
সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানান, সিলেটে সাধারণত দুই ঈদের ছুটিতে পর্যটন খাতে সর্বোচ্চ লেনদেন হয়, যার আর্থিক পরিমাণ ছাড়িয়ে যায় শত কোটি টাকা। তবে এবার পূজার লম্বা ছুটিতে সেই রেকর্ডও ম্লান হয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করছেন স্থানীয় পর্যটন উদ্যোক্তারা।
সব হোটেল-রিসোর্ট ‘ফুল বুকড’:
সিলেট মহানগরের জিন্দাবাজারে অবস্থিত গোল্ডেন সিটি হোটেলের মহাব্যবস্থাপক মৃদুল কান্তি দত্ত বলেন, “বিগত কয়েক বছরের মধ্যে এটি আমাদের সেরা ব্যবসা। ঈদের মৌসুমের চেয়েও এবারের সাড়া অবিশ্বাস্য। প্রায় সপ্তাহখানেক আগেই নগরীর হোটেলগুলোর কক্ষ বুক হয়ে গেছে। দীর্ঘদিন পর সিলেটের পর্যটন খাতে এমন সুবাতাস বইছে।”
একই চিত্র অভিজাত হোটেলগুলোতেও। তিন তারকা মানের গ্র্যান্ড সিলেট হোটেল ও সিলেট রিজেন্সির ডিরেক্টর অব আইটি মো. জাহিদ হোসেন জানান, “পর্যটকদের সাড়া আমাদের ধারণাকেও ছাড়িয়ে গেছে। অন্তত ১২ দিন আগেই প্রতিটি রুম বুকিং হয়ে গেছে এবং আগামী চার দিন পর্যন্ত কোনো কক্ষ খালি নেই।”
এমনকি পর্যটনকেন্দ্র সংলগ্ন রিসোর্টগুলোতেও একই অবস্থা। ভোলাগঞ্জ সাদাপাথর হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টের সিইও শেখ রামিম আহমদ জানান, গত ১৬ অক্টোবর থেকেই তাঁদের সব কটি কক্ষ পূর্ণ হয়ে গেছে, যা আগামী ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে।
রুম না পেয়ে মাজারে আশ্রয়:
হঠাৎ আসা পর্যটকদের অনেকেই রুম না পেয়ে বিপাকে পড়েছেন। চট্টগ্রাম থেকে আসা পর্যটক সবুজ তালুকদার হতাশা প্রকাশ করে বলেন, “আম্বরখানা ও জিন্দাবাজারের বেশ কয়েকটি হোটেল ঘুরেও কোনো খালি কক্ষ পাইনি। পরিবার নিয়ে কোথাও যাওয়ার উপায় না দেখে আপাতত হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারেই অবস্থান নিয়েছি। কোনো কক্ষ খালি পাওয়ার চেষ্টা চলছে।”
পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে উপচে পড়া ভিড়:
সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রকৃতিকন্যা জাফলং, বিছনাকান্দি, মায়াবী ঝরনা, মিঠাপানির একমাত্র সোয়াম্প ফরেস্ট রাতারগুল এবং ভোলাগঞ্জের সাদাপাথরে পর্যটকদের ভিড় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে স্থানীয় প্রশাসন ও মাঝিরা।
নেত্রকোনা থেকে সপরিবারে আসা পীযূষ ঘোষ বলেন, “দীর্ঘ ছুটি পেয়ে পরিবারের সবাইকে নিয়ে এসেছি। সকালে সাদাপাথর ঘুরে বিকেলে মালনীছড়ার নয়নাভিরাম চা-বাগানে এসেছি। প্রকৃতির এমন সবুজ রূপ মন ভরিয়ে দেয়।” অন্যদিকে রাজশাহীর দর্শনার্থী এম এ তাহের জানান, রাতারগুলের সৌন্দর্য ছবিতে দেখার চেয়ে বাস্তবে বহু গুণ বেশি মনোমুগ্ধকর।
পর্যটকদের এই সমাগমে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরেছে স্থানীয় প্রান্তিক অর্থনীতিতেও। সাদাপাথর ঘাটের নৌকার মাঝি তোফাজ্জল ইসলাম বলেন, “ঘাটে প্রায় দেড়শ ইঞ্জিনচালিত নৌকা রয়েছে। পর্যটক আসায় আমাদের দৈনিক ট্রিপ তিন-চারটি থেকে বেড়ে এখন ৭ থেকে ৯টিতে পৌঁছেছে। সবার মুখেই হাসি ফুটেছে।”
সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পর্যটন সাবকমিটির চেয়ারম্যান হুমায়ুন কবির লিটন জানান, প্রায় সাড়ে তিন শতাধিক হোটেল-মোটেল ও রিসোর্ট সম্বলিত সিলেটে এই ঢল পর্যটন ও স্থানীয় অর্থনীতির জন্য নিঃসন্দেহে এক ইতিবাচক মাইলফলক।
সিলেটের প্রধান পর্যটন অধ্যুষিত গোয়াইনঘাট উপজেলার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রতন কুমার অধিকারী জানিয়েছেন, পূজার ছুটির শুরু থেকেই পর্যটকদের নিরাপত্তা ও সুশৃঙ্খল চলাচল নিশ্চিত করতে পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বক্ষণিক নজরদারি ও সব ধরনের সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।