সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড ঘিরে নেটদুনিয়ায় গুজবের ঝড়: ‘বিয়েই করেননি ছেলে’, পরিবারের তথ্যে ভিন্ন চিত্র
শাহ তোফাজ্জুল হোসেন ভান্ডারী, সিলেট প্রতিনিধি:
পবিত্র মক্কার একটি মসজিদে অনৈতিক কাজের অভিযোগে সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে গত কয়েক দিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র আবেগ ও মুখরোচক নানা তথ্যের ছড়াছড়ি চলছে। তবে নেটদুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়া সেসব চটকদার কাহিনীর সিংহভাগই সম্পূর্ণ অসত্য ও কাল্পনিক বলে প্রমাণ মিলছে নিহতের পরিবারের বক্তব্যে।
সামাজিক মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে জোর প্রচার চালানো হয়—দণ্ডপ্রাপ্ত দুজন নাকি নবদম্পতি ছিলেন, বিয়ের পর একসঙ্গে ওমরাহ কিংবা ‘হানিমুনে’ সৌদি আরবে গিয়েছিলেন। এমনকি নামাজ শেষে ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে মসজিদে স্ত্রীর কপালে কিংবা গালে চুমু দেওয়ার কারণেই তাঁদের এই চরম দণ্ড দেওয়া হয়েছে বলেও ভিত্তিহীন দাবি ছড়ানো হয়। তবে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত তরুণ নজরুল ইসলামের পরিবারের সরাসরি বক্তব্যের পর পুরো ঘটনার প্রেক্ষাপট ১৮০ ডিগ্রি মোড় নিয়েছে।
পরিবারের বক্তব্য: ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে গিয়েছিলেন পরিচ্ছন্নতাকর্মী হয়ে:
নিহত নজরুল ইসলামের বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারিত কোনো তথ্যের সঙ্গেই তাঁদের পারিবারিক বাস্তবতার মিল নেই। দরিদ্র পরিবারের অভাব দূর করতে ২০২২ সালে বিভিন্ন উৎস থেকে চড়া সুদে প্রায় সাত লাখ টাকা ঋণ নিয়ে ভাগ্য বদলাতে সৌদি আরবে পাড়ি জমান কৃষক আব্দুল বাছিরের বড় ছেলে নজরুল। সেখানে তিনি কোনো বিলাসবহুল সফরে যাননি, বরং সাধারণ এক পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে হাড়ভাঙা খাটুনি খাটতেন।
সৌদি আরবে পৌঁছানোর প্রায় ছয় মাস পর মক্কার একটি মসজিদে এক তরুণীর সঙ্গে তথাকথিত অনৈতিক কাজের অভিযোগে দেশটির আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হন নজরুল এবং সঙ্গে থাকা সিঁথি আক্তার নামের ওই নারী।
নজরুল যে কারাগারে আটক ছিলেন, সে বিষয়ে পরিবার অবগত থাকলেও ঠিক কী অভিযোগে এবং কোন পরিস্থিতিতে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, তা পরিবারের কাছে কখনো স্পষ্ট ছিল না। দীর্ঘ প্রায় তিন বছর তিন মাস সৌদি কারাগারে বন্দিজীবন কাটানোর পর গত সপ্তাহে নজরুল ও সিঁথি আক্তারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে সৌদি সরকার।
সোশ্যাল মিডিয়ার বিভ্রান্তি বনাম বাস্তবতা:
নজরুলের মা জানান, কারাগারে থাকা অবস্থায় প্রতি রবিবার নিয়ম করে পরিবারের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলতেন ছেলে। অথচ গত বুধবার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আগে পরিবার কিংবা অভিভাবককে সৌদি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কোনো পূর্ব নোটিশ বা তথ্য দেওয়া হয়নি। এমনকি তিনি কোনো আইনি লড়াই বা স্বাধীন আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পেয়েছিলেন কি না, তাও জানতে পারেনি অসহায় পরিবারটি।
পরিবারের তথ্যমতে, ঘটনাটি চার বা পাঁচ মাস আগের কোনো ঘটনা নয়, এটি তিন বছরেরও বেশি সময় আগের পুরোনো মামলা। সবচেয়ে বড় বিষয়, তারা নবদম্পতি হিসেবে ওমরাহ পালন করতে গিয়েছিলেন বা স্ত্রীর কপালে চুমু দিয়েছিলেন—এমন গল্পের কোনো বাস্তব অস্তিত্বই নেই। নজরুলের মা স্পষ্ট জানিয়েছেন, তাঁর ছেলে বিদেশে যাওয়ার আগে বা পরে কখনো বিয়েই করেননি। ফলে কথিত দম্পতি হওয়ার দাবিটি সোশ্যাল মিডিয়ার নিছক কল্পনাপ্রসূত গুজব।
অস্পষ্ট সিঁথির পরিচয় ও দূতাবাসের নীরবতা:
নজরুলের সঙ্গে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত তরুণী সিঁথি আক্তার মূলত কে, তাঁর স্থায়ী ঠিকানা কোথায়, তিনি কি ওমরাহ ভিসায় সৌদিতে গিয়েছিলেন নাকি ভিন্ন কোনো পেশায় ছিলেন—সে বিষয়ে এখনো পর্যন্ত কোনো সরকারি সংস্থা সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেনি। একইভাবে দীর্ঘ তিন বছরের বেশি সময় ধরে সৌদি কারাগারে বিচারপ্রক্রিয়া চলা সত্ত্বেও বাংলাদেশ দূতাবাস বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে কেন সৌদি কর্তৃপক্ষ বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়নি, তা নিয়ে গভীর কূটনৈতিক প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সন্তানকে হারিয়ে নজরুলের পরিবার এখন চরম শোক ও ঋণের বোঝায় দিশেহারা। ঘটনাটি স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাই-বাছাই ছাড়া আবেগপ্রবণ পোস্ট বা মনগড়া তথ্য শেয়ার করা কতটা বিপজ্জনক। এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন প্রচার প্রকৃত সত্য ও আইনি বঞ্চনাকে আড়াল করে সাধারণ মানুষকে দীর্ঘমেয়াদি বিভ্রান্তির দিকে ঠেলে দেয়।
এস এম সোহাগ ফরাজী