মুন্সিগঞ্জে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে আ.লীগ কর্মী জাহেদ বেপারীকে কুপিয়ে হত্যা: অভিযুক্ত ফরিদকে খুঁজছে পুলিশ
স্টাফ রিপোর্টার (শাহ তোফাজ্জুল হোসেন ভান্ডারী):
মুন্সিগঞ্জে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে জাহেদ বেপারী (৫০) নামের এক কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ কর্মীকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনা ঘটেছে।
গতকাল বুধবার (৪ নভেম্বর ২০২৬) রাত পৌনে ১০টার দিকে মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার চরকেওয়ার ইউনিয়নের ভিটিহোগলা গ্রামে এ চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।
নিহত জাহেদ বেপারী ওই গ্রামের বাসিন্দা এবং আওয়ামী লীগের একজন সক্রিয় কর্মী ছিলেন। পরিবার সূত্রে জানা গেছে, তিনি মুন্সিগঞ্জ-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ফয়সাল বিপ্লবের কট্টর সমর্থক হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে কুপিয়ে জখম:
নিহতের স্বজনরা জানান, বুধবার রাতে জাহেদ বেপারী নিজ বাড়িতেই অবস্থান করছিলেন। এ সময় প্রতিপক্ষের লোকজন তাঁকে কথা বলার কথা বলে বাড়ি থেকে ডেকে বাইরে নিয়ে যায়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আগে থেকে ওত পেতে থাকা সন্ত্রাসীরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাঁর ওপর অতর্কিত আক্রমণ চালায় এবং এলোপাতাড়ি কুপিয়ে রক্তাক্ত জখম করে ফেলে রেখে যায়।
আশঙ্কাজনক অবস্থায় স্থানীয় ও পরিবারের লোকজন তাঁকে উদ্ধার করে দ্রুত মুন্সিগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে তাঁর অবস্থার মারাত্মক অবনতি হলে জরুরি বিভাগের চিকিৎসকরা কালক্ষেপণ না করে তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে পাঠান। ঢামেকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাতেই অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তাঁর মৃত্যু হয়। বর্তমানে ময়নাতদন্তের জন্য তাঁর মরদেহ ঢামেক মর্গে রাখা হয়েছে।
দুই এমপির পুরোনো দ্বন্দ্ব ও ওরস বিরোধের অভিযোগ:
হত্যাকাণ্ডের পেছনে পুরোনো রাজনৈতিক শত্রুতা এবং স্থানীয় বিরোধের অভিযোগ তুলেছেন নিহতের স্ত্রী বেবী বেগম। তিনি জানান, প্রধান অভিযুক্ত ফরিদ হোসেন ও তার সহযোগীরা বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মুন্সিগঞ্জ-৩ আসনের আরেক সাবেক সংসদ সদস্য মৃণাল কান্তি দাসের বলয়ের সমর্থক ছিলেন। জাহেদ সাবেক সংসদ সদস্য ফয়সাল বিপ্লবের অনুসারী হওয়ায় স্থানীয় আধিপত্য নিয়ে সেই সময় থেকেই তাঁদের মধ্যে চরম দ্বন্দ্ব চলছিল।
বেবী বেগমের অভিযোগ, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ফরিদ ও তার সহযোগীরা এলাকায় নিজেদের প্রভাব বজায় রাখতে দলবদল করে নানা অপতৎপরতা চালিয়ে আসছিল। এছাড়া আগামী শুক্রবার ভিটিহোগলা গ্রামের একটি স্থানীয় মাজারের ওরস আয়োজনকে কেন্দ্র করেও তাঁদের সঙ্গে জাহেদের সাম্প্রতিক বিরোধ সৃষ্টি হয়েছিল। এসবের জেরেই পরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ড চালানো হয়েছে বলে পরিবারের দাবি।
‘আমাদের চোখের সামনে বাবাকে কুপিয়ে মারল’:
বাবার বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের বিচার চেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন নিহতের বড় মেয়ে ফারিয়া আক্তার। বুক চাপড়ে তিনি বলেন, “আমার প্রতিবন্ধী বোন মারিয়া ও ছোট বোন ইমাসহ আমরা তিন বোন চোখের সামনে বাবাকে কুপিয়ে রক্তাক্ত করতে দেখেছি। আমরা বাবার আর্তনাদ শুনেছি। মুহূর্তের মধ্যে আমাদের তিন বোনকে চিরদিনের জন্য এতিম বানিয়ে দেওয়া হলো। এই ভয়াল স্মৃতি আমরা কীভাবে সারাজীবন বয়ে বেড়াব? যারা আমার বাবাকে এভাবে কেটে হত্যা করল, তাদের দৃষ্টান্তমূলক ফাঁসি চাই।”
অভিযুক্তকে ধরতে পুলিশের অভিযান:
হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে মুন্সিগঞ্জ সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. তছলিম উদ্দিন জানান, প্রাথমিক তদন্তে দীর্ঘদিনের পূর্ববিরোধের জেরেই এই সহিংস আক্রমণ ও হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। তবে এর পেছনে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব নাকি ওরস সংক্রান্ত বিরোধ রয়েছে, তা নিশ্চিত হতে পুলিশ সব দিক খতিয়ে দেখছে।
ওসি আরও উল্লেখ করেন, ঘটনার সাথে জড়িত মূল অভিযুক্ত ফরিদ বেপারীকে গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক টিম মাঠে নেমেছে এবং সাঁড়াশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে। অভিযুক্ত ফরিদের বিরুদ্ধে অতীতেও হত্যা ও মাদক কারবারসহ বিভিন্ন অভিযোগে একাধিক মামলা রয়েছে। এ ঘটনায় থানায় একটি হত্যা মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
এস এম সোহাগ ফরাজী
দৈনিক জীবনযাত্রা